যমুনা নদীবেষ্টিত মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম বাঘুটিয়া চরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চরম বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম জেঁকে বসেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষক বছরের পর বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। ফলে কোথাও দপ্তরি, কোথাও অভিভাবক, আবার কোথাও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ‘প্রক্সি শিক্ষক’ হিসেবে নামমাত্র পাঠদান করছেন।
সরেজমিনে উপজেলার ৪২ নম্বর রংদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৪ নম্বর চর কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৫ নম্বর বাঘুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কোনো শিক্ষকের দেখা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন পাঠদান বন্ধ থাকায় শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ড ও বেঞ্চে জমেছে ধুলোবালির স্তর। শিক্ষকের অভাবে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার বদলে আড্ডা ও গল্প করে সময় পার করছে।
সাংবাদিকের উপস্থিতির খবর পেয়ে কয়েকজন শিক্ষক তাড়াহুড়ো করে বিদ্যালয়ে হাজির হন। ৪২ নম্বর রংদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুলাইমান হোসেন দেরিতে আসার কথা স্বীকার করে জানান, তার অনুপস্থিতিতে দপ্তরিই ক্লাস নেন। একই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা দেরির জন্য জেয়াসমিন সুলতানা অসুস্থ সন্তানের অজুহাত দেন। সময় মতো স্কুলে আসতে না পারার জন্য নদীপথের সমস্যার কথা জানান আরেক শিক্ষক আমিনুল ইসলাম।
তদন্তে চর কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আবিদা সুলতানার বিরুদ্ধে নীতিবহির্ভূতভাবে চতুর্থ সন্তানের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তার অনাগত সন্তান গর্ভেই নষ্ট হয়ে গেলেও তিনি সরকারি সুবিধা নিতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন।
একই বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষিকা নুরজাহান আক্তার স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করে মাসে মাত্র কয়েকদিন এসে বেতন তুলে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ওই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক মানোয়ার হোসেনের অনুপস্থিতিতে ধামরাইয়ের একটি মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীকে ‘প্রক্সি শিক্ষক’ হিসেবে ক্লাস নিতে দেখা যায়।
পরে প্রধান শিক্ষক মোটরসাইকেলে এসে দাবি করেন, তিনি ওষুধ আনতে গিয়েছিলেন।
শিক্ষার্থীদের টিফিন বিতরণেও অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রুটি ও ডিম দেওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শুধু রুটি দেওয়া হচ্ছে। বিস্কুট ও দুধের বরাদ্দ থেকেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। অনেক ক্ষেত্রে টিফিন একেবারেই দেওয়া হয় না বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চললেও শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।
বাঘুটিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষকদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসার বিষয়টি ইউএনও ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার গোকুল চন্দ্র দেবনাথ জানান, অভিযোগগুলো তদন্ত করে নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফারজানা প্রিয়াঙ্কা বলেন,, শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এলে শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


