মৌলভীবাজারে বৃষ্টিতে নষ্ট ১৭ হাজার টন ধান

মৌলভীবাজারে বৃষ্টিতে নষ্ট ১৭ হাজার টন ধান
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

মৌলভীবাজারে পাহাড়ি ঢল, টানা অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে হাওড় ও ননহাওড় অঞ্চলের অন্তত ৪ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে প্রায় ১৬ হাজার ৯০৯ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৮২ কোটি টাকার বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২৫ হাজার কৃষক।

ডিএই মৌলভীবাজার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত দফায় দফায় ভারী বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও শিলাবৃষ্টিতে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো খেত পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও পাকা ধান কাটা সম্ভব হয়নি, কোথাও জমিতেই ধান নষ্ট হয়েছে।

ননহাওড় অঞ্চলের সাত উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৩৫ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার ৯৭২ হেক্টর জমিতে তখনও দণ্ডায়মান ধান ছিল। দুর্যোগে ১ হাজার ৮৪৭ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৬৬ হেক্টরের ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৌলভীবাজার সদর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলায়। সদর উপজেলায় ৬০৬ হেক্টর, কমলগঞ্জে ৩৭৫ হেক্টর এবং কুলাউড়ায় ৫৪০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কৃষি বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিলাসছড়া ও লাংলিয়াছড়ার পাড় ভেঙে অন্তত ২৫০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এ ছাড়া লাউয়াছড়ার পানি ঢুকে ভানুবিল, ছনগাঁও, নয়াপত্তন ও উত্তরভাগ গ্রামের ফসলি জমি প্লাবিত হয়। গোগালিছড়ার পাড় ভেঙে হাজীপুর, রাতগাঁও ও টিলাগাঁও গ্রামেও ক্ষতি হয়েছে।

ননহাওড় এলাকায় উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৮১০ মেট্রিক টনের বেশি। আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, জেলার হাওড়াঞ্চলে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৭৩৮ হেক্টরের ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে রাজনগর উপজেলায়। সেখানে ১ হাজার ২৩৮ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া, জুড়ীতে ৪৭০ হেক্টর এবং শ্রীমঙ্গলে ২৬৫ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হাওড় অঞ্চলে উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৯৯ মেট্রিক টনের বেশি। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অনেকে জানিয়েছেন, ধারদেনা করে চাষাবাদ করেছিলেন তারা। ধান ঘরে তোলার আগেই ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কাটা ধান পানিতে ভেসে গেছে, কোথাও জমিতেই পচে নষ্ট হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহের পর কয়েকটি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘কৃষকের দুঃখের সীমা নেই। কিন্তু আমরা কী করব। হাওড় এবং ননহাওড় মিলিয়ে ৪ হাজার ২০৬ হেক্টর ফসলি জমি একেবারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন করা হয়েছে। আমাদের ক্ষতির পরিমাণ মাপার জন্য কোনো যন্ত্রপাতি নেই। বাস্তবে ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কাওয়াদীঘি হাওরে। বিশেষ করে রাজনগর ও সদর উপজেলার অংশে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।’

জালাল উদ্দীন বলেন, ‘আমার ধারণা ৭০ শতাংশ ক্ষতি কাওয়াদীঘি হাওরে হয়েছে। এরপর হাকালুকি হাওরের ভুকশিমইল এলাকায় ক্ষতি হয়েছে। সরেজমিনে আমরা এ তথ্য পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কাওয়াদীঘি হাওরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। সেখানে ব্যবহৃত সেচ পাম্প পুরোনো হয়ে গেছে এবং ক্যানেলে পানির প্রবাহ কমে গেছে।’

‘কাওয়াদীঘি হাওরের সেচ পাম্প অনেক পুরোনো। পানির প্রবাহ ঠিকমতো না থাকায় পানি নামতে পারেনি। এটি বড় সমস্যা তৈরি করেছে।’

তিনি জানান, পাম্প চালাতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

‘আমার মতে, ছয়টির পরিবর্তে ১৫টি পাম্প একসঙ্গে চালানো গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাওরের পানি কয়েক ইঞ্চি কমে যেত।’

তিনি কাওয়াদীঘি হাওর রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, শক্তিশালী পাম্প ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হবে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, মৌলভীবাজারের হাওড়াঞ্চল দেশের বোরো উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এ অঞ্চলের ফসলহানি স্থানীয় কৃষকের পাশাপাশি সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের অনুলিপি সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad