স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বির হত্যা মামলায় ‘শুটার’ মো. রহিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত।
মঙ্গলবার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমান এ আদেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের পরিদর্শক মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম আসামি রহিমকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
রিমান্ডের আবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়া আরেক ‘শুটার’ জিন্নাত আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে রহিমের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘রহিমই মোসাব্বিরকে গুলি করেন।’ পাশাপাশি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, ঘটনার সময় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধার, মূল পরিকল্পনাকারী চিহ্নিতকরণ, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং আর্থিক লেনদেনের উৎস খুঁজে বের করার জন্য আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরলে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
‘শুটার’ রহিমকে গত ২০ জানুয়ারি সকালে নরসিংদী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও ১২ রাউন্ড গুলিও উদ্ধার করা হয়েছে।
পর দিন ২১ জানুয়ারি সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ‘কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিদেশে অবস্থানরত আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী বিনাশ দাদা ওরফে দিলীপের নির্দেশে মোসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, দ্বন্দ্ব থেকেই বিনাশের নির্দেশে শুটার রহিম এবং জিন্নাত কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেয়।’
ডিবি প্রধানের দাবি, ‘বিদেশে অবস্থানরত দিলীপ ওরফে বিনাশের নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ড। কারওয়ানবাজার কেন্দ্রীক আট থেকে নয়টি চাঁদাবাজ গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।’
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকার পশ্চিম তেজতুরী পাড়ায় হোটেল সুপার স্টারের পাশের একটি গলিতে মোটরসাইকেলে আসা হামলাকারীরা মোসাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
এ সময় তার সঙ্গে থাকা আবু সুফিয়ান ব্যাপারি মাসুদও আহত হন। মোসাব্বির আগে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আহত মাসুদ তেজগাঁও থানার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক।
স্থানীয়রা আহত দুজনকে উদ্ধার করে বিআরবি হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মোসাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে আহত মাসুদকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় ৮ জানুয়ারি নিহত মোসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, এ হত্যা মামলায় দুই শুটারের একজন জিন্নাত, ঘটনার মূল সমন্বয়কারী মো. বিল্লাল, আসামিদের আত্মগোপনে সহায়তাকারী আব্দুল কাদির এবং ঘটনার আগের দিন এলাকায় রেকি করা মো. রিয়াজকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ সময় তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত নম্বরবিহীন একটি মোটরসাইকেল ও নগদ ছয় হাজার টাকা জব্দ করা হয়। এর আগে, গত ১২ জানুয়ারি জিন্নাত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
কে এই বিনাশ দাদা?
কারওয়ান বাজার ও বসুন্ধরা সিটির সামনের ফুটপাতের একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর ধরে তারা দিলীপ বা বিনাশ দাদা নাম শুনলেও কেউ তাকে দেখেননি। এই পরিচয়ে বিজিন্নজনের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে মোবাইল ফোনে কল আসে। চাঁদা দাাবি করে হুমকি দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বসুন্ধরার সামনে ফুটপাতের ৫০ থেকে ৬০টি দোকানে দিলীপের লোকজন চাঁদা দাবি করে। চাঁদার টাকা না পেয়ে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় এবং একাধিক দোকানে অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনায় আমান নামে এক ব্যবসায়ী দিলীপের ঘনিষ্ট সুমনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা করেন। পরে প্রাণনাশের হুমকি দিলে তিনি সেই মামলা প্রত্যাহার করে নেন।
অপরদিকে, গত ৭ ডিসেম্বর মোসাব্বির খুনের পর দিলীপ পরিচয়ে একাধিক বিদেশি নম্বর থেকে আখতার, রনি, মিলন ও সাগর নামে চার ব্যবসায়ীকে কল করে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।
তাদের বলা হয়েছে, ‘তোর ভাইরে খাইছি, তোরেও খামু, তরে ফাইলা দিমু।’ এ হুমকির পর তাদের তিনজনই জিডি করেছেন।
এরপর গত ১০ ডিসেম্বর ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ করতে একটি বিদেশি নম্বর দেওয়া হয়। হুমকির বিষয়টি তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) জানানো হয়। কিন্তু নিরাপত্তা দিতে পারবেন না জানিয়ে সবাইকে সাবধানে থাকতে পরামর্শ দেন তিনি। ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মুর্শেদও তাদের একজনকে একই পরামর্শ দিয়েছেন।
ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দিলীপ আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন সন্ত্রাসী।
পুলিশের এক কর্মকর্তার কাছে থাকা তথ্যমতে, দিলীপের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। তিনি এক সময় ঢাকার কাঁঠালবাগান এলাকায় অপরাধ জগতে সক্রিয় ছিলেন।


