মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা বা নাটকে অনেক সময় গল্পের চেয়ে চরিত্রটাই বড় হয়ে ওঠে। কারণ এই চরিত্রগুলো কেবল পর্দার মানুষ নয়; তারা একটি সময়, একটি মানসিকতা, একটি সংগ্রামের প্রতিনিধি। তাই দশক পেরিয়ে গেলেও কিছু চরিত্র আমাদের মাথা থেকে যায় না। তারা ইতিহাস বইয়ের তথ্য হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে অনুভূতির অংশ।
‘ওরা ১১ জন’-এর মুক্তিযোদ্ধাদের কথাই ধরলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আলাদা করে নাম মনে না থাকলেও সম্মিলিতভাবে তারা একটি শক্ত প্রতীক। ছাত্র, কৃষক, মধ্যবিত্ত—সব শ্রেণির তরুণ একসঙ্গে অস্ত্র ধরেছে। তারা কেউ সুপারহিরো নয়, একেবারেই সাধারণ মানুষ। এই সাধারণত্বই তাদের আজও বিশ্বাসযোগ্য করে রেখেছে। দর্শক বুঝে নেয়, এই যুদ্ধ কেবল বীরদের নয়; আমাদের মতো মানুষেরই ছিল।
আবার ‘জীবন থেকে নেয়া’ সরাসরি যুদ্ধের সিনেমা নয়, কিন্তু এটি স্বাধীনতার সিনেমা। আনোয়ারার নীরব প্রতিবাদ আর রওশন আরার দমনমূলক উপস্থিতি আসলে পুরো পাকিস্তানি শাসনের রূপক। সংসারের ভেতর দিয়েই এখানে রাজনৈতিক বক্তব্য আসে। দর্শক নিজের ঘরের ভেতরেই যুদ্ধটা চিনে ফেলে। তাই এই চরিত্রগুলো কেবল গল্পের অংশ নয়, হয়ে ওঠে সময়ের দলিল।
‘আগুনের পরশমণি’-র বাবা চরিত্রটি যুদ্ধ না করেও মুক্তিযুদ্ধের ভার বহন করে। ভয়, দ্বিধা, দায়িত্ব আর ভালোবাসার টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটির মধ্যে অনেক দর্শক নিজের বাবাকে খুঁজে পায়। এই পরিচিত মুখটাই চরিত্রটিকে স্মৃতিতে গেঁথে দেয়।
কিন্তু এই স্মৃতির রাজ্যে দীর্ঘদিন নারীর জায়গা ছিল একপেশে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমায় নারী মানেই প্রায়শই ভিকটিম। নির্যাতিত মা বা বোন, শহীদের বিধবা, কিংবা পুরুষের লড়াইয়ের প্রেরণা। তারা গল্পে আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় না। যুদ্ধ করে না। প্রতিরোধ গড়ে তোলে না। যেন ইতিহাসে নারীর একমাত্র ভূমিকা ছিল সহ্য করা।
বাস্তব ইতিহাস অবশ্য অন্য কথা বলে। নারীরা অস্ত্র ধরেছে, গুপ্তচরবৃত্তি করেছে, আশ্রয় দিয়েছে, বার্তা বহন করেছে, আহতদের সেবা করেছে। তারা ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে লড়েছেও। এই বাস্তবতাকে সিনেমা দীর্ঘদিন এড়িয়ে গেছে। কারণ পুরুষের হিরোইজমের গল্প বানানো সহজ, আর শক্ত নারী দেখালে পুরুষকেন্দ্রিক ন্যারেটিভে ফাটল ধরে।
তবু পরিবর্তনের আভাস এসেছে। ‘গেরিলা’-র নারী যোদ্ধারা করুণার পাত্র নয়; তারা সক্রিয় প্রতিরোধের অংশ। ভয় আছে, ক্ষতি আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তে তারা দৃঢ়। টেলিভিশনের অনেক বিজয় দিবসের নাটকে আবার দেখা যায় নীরব বাবা-মা কিংবা গ্রাম্য চরিত্র—যারা খুব কম কথা বলে, কিন্তু চোখ আর নীরবতায় পুরো যুদ্ধটা বলে দেয়। এই চরিত্রগুলো মনে থাকে, কারণ তারা অভিনয়ের চেয়ে অনুভূতিতে বেশি সত্য।
এই সব চরিত্র এখনো মনে থাকে একটাই কারণে। তারা আদর্শের পোস্টার নয়, দ্বন্দ্বে ভরা মানুষ। ভয় পেয়েও দাঁড়িয়ে থাকা, হারিয়েও বিশ্বাস রাখা—এই মানবিক জায়গাটাই তাদের সময়ের বাইরে নিয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরও সিনেমা আসবে। প্রশ্ন শুধু একটাই—সেই সিনেমাগুলো কি নারীকে শুধু স্মৃতির ক্ষত হিসেবে দেখাবে, নাকি পুরুষের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধের শরীর হিসেবেও দেখাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেবে, আমাদের পর্দার ইতিহাস কতটা সম্পূর্ণ হবে।


