ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গুঞ্জন উঠেছে, তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয়রা অনেক নেতাই বিধানসভায় দলের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাখতে চাইছেন না।
দলীয় সূত্রের বরাতে ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়, বিরোধী দলনেতা নিয়োগের প্রশ্নে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এরইমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে।
গত রোববার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে ডাকা এক বৈঠকে তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই অনুপস্থিত ছিলেন। এর মধ্য দিয়েই দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অসন্তুষ্ট বিধায়কদের আবারও দলের সঙ্গে একত্রিত করতে এবং বিধানসভায় দলের ঐক্য বজায় রাখতে কলকাতায় জোর তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে।
সূত্রের দাবি, দলটির একাংশ মমতার সমর্থকদের মধ্যে ‘বিদ্রোহী’ তকমা পাওয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন দিতে প্রস্তুত রয়েছেন। তবে গত সোমবার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেক বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এ কারণে ঋতব্রতকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে সমর্থনের সিদ্ধান্তকেও দলের বর্তমান প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থানের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলীয়ভাবে বিরোধী দলের নেতা পদের জন্য মমতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মনোনীত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে অসন্তোষ ও বিভাজন ক্রমেই বাড়ছে। সূত্রগুলোর দাবি, নেতাদের ক্ষোভ মূলত দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নয়।
এরইমধ্যে বিরোধী দলনেতা নিয়োগকে ঘিরে নতুন এক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সোমবার রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনয়নের জন্য স্পিকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে তৃণমূলের কয়েকজন বিধায়কের সই জাল করা হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘তৃণমূলের দুই বিধায়ক- ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা অভিযোগ করেছেন, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে সমর্থন জানিয়ে পাঠানো দলীয় চিঠিতে তাদের সই জাল করা হয়েছে। তারা কেউ শোভনদেবের পক্ষে সই করেননি।’
‘তৃণমূলের দুর্নীতি শুধু বাংলার মানুষের বিরুদ্ধেই নয়, নিজেদের বিধায়কদের বিরুদ্ধেও হয়েছে। তৃণমূল নিজেদের বিধায়কদের সই চুরি করেছে। অভিযোগটি করেছেন তৃণমূলেরই দুই বিধায়ক। এতে তো আমাদের কোনো ভূমিকা নেই। তাদের দুর্নীতি নিজেদের কথাতেই প্রকাশ পাচ্ছে’, যোগ করেন শুভেন্দু।
এই অভিযোগের পরই দুই বিধায়ককে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হয়। সন্দীপন সাহা অবশ্য এই ঘটনার পেছনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করেন। তার দাবি, বিধায়কদের তালিকায় তাদের হয়ে সই করেছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিধায়কদের সই জালিয়াতির অভিযোগের তদন্ত করছে পশ্চিমবঙ্গের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। এ মামলায় তৃণমূলের একাধিক নেতাকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এমনকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল তদন্তকারী সংস্থা।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের নেতাদের ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। রাজ্যের ক্ষমতা হারানোর পর দলের একাধিক নেতা প্রকাশ্যে দলের কার্যক্রম ও পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কটাক্ষ করে সোমবার ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত দলে শুধু খালা ও ভাতিজা- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থাকবেন। বাকি সব নেতাই দল ছেড়ে চলে যাবেন।’


