কুষ্টিয়া শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা প্রায় দুই বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে। শহরের ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থাপিত এসব ক্যামেরা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং পুলিশি তদন্ত কার্যক্রমে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
প্রযুক্তিনির্ভর এই অত্যাবশ্যকীয় নজরদারি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় শহরের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং সচেতন মহলের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো যখন সচল ছিল, তখন শহরে অপরাধ প্রবণতা অনেক কম ছিল। কারণ অপরাধীরা জানত যে তাদের প্রতিটি গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড সার্বক্ষণিক ক্যামেরার নজরদারির আওতায় রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নজরদারি ব্যবস্থা অচল থাকায় অপরাধীদের সেই মানসিক ভীতি অনেকটাই কেটে গেছে। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আগে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও জনসমাগমস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরার উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে অন্তত একটি নিরাপত্তার অনুভূতি জোগাত। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা না থাকায় শহরে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটলেও অপরাধীদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
থানাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. আশিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে রাতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সন্দেহজনক লোকজনের চলাচল বেড়েছে। সিসিটিভি থাকলে অপরাধীরা কিছুটা ভয় পেত। আধুনিক শহরের নিরাপত্তার জন্য এই ব্যবস্থা আবার চালু করা খুবই জরুরি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের শুরুতে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের বিশেষ উদ্যোগে শহরের ২৩টি কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কার্যালয় থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণ, সড়কে যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হতো।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং এর পরের অস্থিরতার সময় বেশিরভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু ক্যামেরা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সেগুলো মেরামত কিংবা পুনঃস্থাপনে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিসিটিভি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরাসরি সরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ ছিল না। তৎকালীন সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আর্থিক সহযোগিতায় এ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সুশীল সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ও সহযোগিতা ছাড়া এত বড় প্রকল্প পুনরায় চালু করা সহজ হবে না।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, সিসিটিভি ক্যামেরা অচল থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি ও ব্যক্তিগত স্থাপনায় থাকা ক্যামেরার ফুটেজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিষয়টিকে পুলিশ প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখেছে। সরকারি বরাদ্দ এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত ক্যামেরাগুলো পুনঃস্থাপনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।


