পথশিশুদের চুরি হওয়া শৈশব 

পথশিশুদের চুরি হওয়া শৈশব 
রাজধানীূর একটি মোটর গ্যারেজে কাজ করছে শিশুরা। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

রাত গভীর হলে ঢাকার কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে এক প্লাস্টিকের শিটে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে দশ বছরের রুবেল। দিনের বেলা বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করে চলে তার জীবিকা। এভাবেই চলছে তার বেঁচে থাকার লড়াই।

সেখানকারই একটি হোটেলে কাজ করছে ১৩ বছরের সোহান। সে বলে, ‘বাপ নাই, আম্মা বাড়িতে থাকে। টাকা কামানোর জন্য এহানে থাকি’।

এতো অল্প বয়সে কাজ করার বিষয়ে সে জানায়, ‘কাম না করলে টাকা কই পামু। বাড়িতে আম্মারে টাকা পাঠানো লাগে।’

রুবেল-সোহানের মতো হাজারো শিশু এভাবেই দেশের বিভিন্ন রাস্তার ফুটপাতে বেড়ে উঠছে। যাদের নেই কোন জন্ম সনদ, স্কুলে যাওয়ার সুযোগ। অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্যও নেই তাদের।

এদিকে, প্রতি বছর ২ অক্টোবর বাংলাদেশে ‘জাতীয় পথশিশু দিবস’ পালিত হয় শিশুদের সুরক্ষা ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। দিবসটিতে নানা কর্মশালা ও সুপারিশ উঠে আসলেও বাস্তবে খুব কমই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এমনকি রাজধানীর কমলাপুর ও কারওয়ান বাজারে দুটি সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে যেখানে পথশিশুদের রাখা হয়। কিন্তু সেখানে থাকা ও সুবিধা পাওয়া শিশুর সংখ্যা খুবই কম।

বাংলাদেশে শিশু অধিকার আইন-২০১৩ এবং শিশু শ্রম নিষিদ্ধ করা থাকলেও বাস্তবে আইন প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সরকারি উদ্যোগের মধ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র চালাচ্ছে।

আরও পড়ুন

দেশে পথশিশুদের জীবনধারা নিয়ে বেশকিছু গবেষণা হয়েছে। ২০২২ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের স্ট্রিট চিলড্রেন সার্ভে অনুযায়ী, দেশে ৮২ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু পথচারীদের দ্বারা নির্যাতিত বা হয়রানির শিকার হচ্ছে। উন্মুক্ত স্থানে বসবাস করছে ৩০ দশমিক ১ শতাংশ শিশু এবং ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু লিখতে ও পড়তে জানে না।

বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ পথশিশু অংশগ্রহণ করছে। অর্থাৎ ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ শিশু কোনো সরকারি সহায়তা পাচ্ছে না। নিরাপত্তাহীন পরিবেশে বেড়ে ওঠা এসব শিশুরা সহিংসতা, মাদকাসক্তি ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ শিশু জন্ম সনদবিহীন, ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন অবস্থায় রয়েছে।

ব্যাটারি কারখানায় কাজ করছে এক শিশু। ছবি: ইউনিসেফ

 

শিশু বিশেষজ্ঞরা জানান, শিশুরা পথে আসে দারিদ্র্য, পরিবার ভাঙন, গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন, শিশুশ্রম, পারিবারিক সহিংসতা বা সৎ মায়ের নির্যাতনের কারণে। অনেকে আবার পরিবার থেকে একা হয়ে গেছে। ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনালই তাদের ঘর। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই অপুষ্টি ও রোগে ভুগছে এবং নেশাজাতীয় দ্রব্যে আসক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

পথশিশুদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা লিডো ফাউন্ডেশন। এই সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন তার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতারন আলোকে বলেন, ‘বড় সংকট হচ্ছে সমাজ তাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করছে না। রাষ্ট্রের মানসিকতার পরিবর্তন করা দরকার।’ তার মতে, শিশু আইন-২০১৩ সম্পূর্ণরুপে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আইন থাকলেই হবে না, এর এক্সিকিউশন দরকার। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে তিনি ‘ভিকটিম সেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গ’ প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন তিনি।

পথশিশুদের পুনর্বাসন নিয়ে কথা হয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক খলিল আল রশীদের সঙ্গে। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য প্রায় দুই মাস আগে ‘শিশু সুরক্ষা শাখা’ খোলা হয়েছে। তবে এখনও সেভাবে কাজ শুরু করা হয়নি। তবে আমরা পথ শিশু পুনর্বাসনে ইউনিসেফ, সেভ দ্যা চিলড্রেনসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করছি।’

‘চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ’ এর সাবেক সহকারী প্রকল্প পরিচালক এমরান খানের মতে, কেবল সরকারি উদ্যোগে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, জাতীয় রেফারেল মেকানিজম কার্যকর করা দরকার। যাতে দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ না থাকে। পাশাপাশি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে লিড মিনিস্ট্রি হিসেবে থেকে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রকল্পগুলো পর্যাপ্ত নয়, তাই এরিয়া ভিত্তিক প্রকল্প নেওয়া জরুরি। অভিজ্ঞ এনজিওদের মাঠপর্যায়ে যুক্ত করে সরকারকে তদারকি ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব নিতে হবে। একই সঙ্গে মাঠকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় কমিউনিটি ও সরকারি ব্যাকিং নিশ্চিত করতে হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad