ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এখন ভোটের মাঠে জোটের রাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ চলছে। দীর্ঘদিন বড় কোনো দলের জোটসঙ্গী থাকলেও শেষ মুহূর্তে এসে কাঙ্ক্ষিত আসন না পেয়ে ছোট ছোট দল বাঁক বদল করে জোট বদলের কথাও ভাবছে। তাই, এবারের সংসদ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ৫টি দৃশ্যমান পাঁচটি জোট হলে সামনে এর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। জোট বদল বা নতুন জোট গঠনের ক্ষেত্রে ছোট দলগুলোর নেতারা এখন লাভ-ক্ষতির হিসেবে ব্যস্ত।
আওয়ামী লীগ ছাড়া এবারের ভোটে মূলত বিএনপি জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর আসন সমঝোতার নির্বাচনী জোটের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সম্প্রতি নানা জরিপ এবং মাঠের চিত্র বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
ইতোমধ্যে বিএনপির ঘোষিত ২৭২ আসনের প্রার্থীরা এখন ভোটের মাঠে। অবশিষ্ট ২৮ আসনে শরিকদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মধ্যে আগামী সপ্তাহের মধ্যে প্রার্থী তালিকা প্রকাশের কথা ভাবছেন দলটির নেতারা। দলটির কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত আসন না পেয়ে ক্ষুব্ধ মিত্রদের অনেকে বিএনপির বিরুদ্ধে সরব। আবার অনেকে কৌশলগত কারণে নীরব।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনে আগে ছোট ছোট দলগুলোর অসন্তোষ নতুন কিছু নয়। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি মিত্র সবাইকে নিয়েই আগামীতে পথচলার।’
আসন সমঝোতায় জামায়াতের সমমনাদের মধ্যে এখনো কোনো অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। দলগুলো যে যার মতো প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে থাকলেও জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের সমমনা ৮-দল আগামী সপ্তাহের প্রথম ভাগে সমন্বিত প্রার্থী তালিকা প্রকাশে কাজ করছে জোরেসোরে।
নির্বাচনের আগেই নতুন জোট গঠনের ঘটনা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন জামায়াতের ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুয়াবের। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমরা আগামী সপ্তাহেই ৮ দলের যৌথ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবো। আমরা ঐক্যকে গুরুত্ব দিচ্ছি।’
পাঁচ দলের জোটে কে কার সঙ্গে
বিএনপির সঙ্গে ১২-দলীয় জোট, ১১ দলের জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, পাঁচদলীয় গণতন্ত্র মঞ্চ, এলডিপি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম), গণঅধিকার পরিষদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও গণফোরাম রয়েছে। সরাসরি জোটে না থাকলেও কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লেবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) বিএনপির সমমনা দল।
আসন সমঝোতায় জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশে ডেভলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি) ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট গঠন করেছে।
নতুন আত্মপ্রকাশ পাওয়া জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক জোটে রয়েছে, জাতীয় পার্টি (জেপি), জাতীয় পার্টি (আনিস-হাওলাদার), জাপা (মতিন), মুসলিম লীগসহ ১৮টি দল।
সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, বাংলাদেশ জাসদ, ঐক্য-ন্যাপ, বাসদ (মাহবুব) মিলে গঠন করেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট।
আসন না পেয়ে জোট বদলের চেষ্টা
ইতোমধ্যে বিএনপি যে ২৭২ আসনে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে সেখানে দলটির দীর্ঘদিনের মিত্র দলের শীর্ষ নেতারা অনেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কেউ আসন বঞ্চিত হয়ে কেউ আবার বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বুধবার রাজধানীর পল্টনে নাগরিক ঐক্যের কার্যালয়ে দীর্ঘ বৈঠকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘ন্যায্য সমঝোতা’ না করলে বিএনপির ছেড়ে নতুন জোট গঠনের আলটিমেটাম দেয় বিএনপির ২৯ মিত্র দল, যার মধ্যে রয়েছে, গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, গণঅধিকার পরিষদ, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, নেজামে ইসলামী পার্টি ও গণফোরাম।
তাদের এ আলটিমেটামে সাড়া দিয়ে বিএনপি বৃহস্পতিবার রাতে মিত্র দলের ১৫ শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছে। সেখানে তাদেরকে মূল্যায়ন করা হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান সমন্বয়ক ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা আমাদেরকে মূল্যায়ন করবে বলে জানিয়েছেন। আমরা অপেক্ষা করছি বিএনপির সিদ্ধান্তের দিকে।’
জানা গেছে, ন্যূনতম জোটের বা দলগুলোর পরিচিত মুখ বা শীর্ষ নেতাদের আসন না দিলে বেশ কয়েকটি দল বিএনপির জোটের থেকের বের হয়ে নতুন জোটের ঘোষণা দিতে পারে। অনথ্যায় অন্য কোনে জোটে তারা যোগ দিতে পারে।
আর আগেই আসন বঞ্চিত হয়ে বিএনপিকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে সঙ্গ ছাড়া ঘোষণা দিয়েছে লেবার পার্টি। দলটি জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া আসন না পাওয়ার শঙ্কায় রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন গণতন্ত্র মঞ্চ ছেড়ে এনসিপির সঙ্গে জোট গড়েছে।
জোটহীন জিএম কাদেরের জাতীয় পার্টি
নানা শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা থাকলেও জাতীয় পার্টির (জাপা) মূল ধারাটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জিএম কাদের) এর নেতৃত্বাধীন দলটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে।
পতিত আওয়ামী লীগের শেষ চার টার্মের শাসনামলের শেষদিন পর্যন্ত দলটিকে সহায়তাকারী জাপার সাংগঠনিক অবস্থা এখন বেশ নাজুক অবস্থা। গত বছরের ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ হিসেবে চাপে রয়েছে জাপা।
দলটি এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত কারও সঙ্গে জোট করেনি। তবে, নিজ দলের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ‘ক্লিন ইমেজের’ বা দলটির পদ-পদবিতে ছিলেন না এমন কিছু জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে দলটি ইতিবাচক বলেও জানা যাচ্ছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। এখন দলটি প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করবে।


