৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় দুই শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তবুও সরকারি সাহায্য পৌঁছায়নি উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরায়। স্থানীয় বাসিন্দারা খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভয়াবহ এই দুর্যোগেও ধ্বংসস্তূপ ও দোকানপাটে লুটপাট চালাচ্ছে কয়েকটি গ্রুপ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিনিধির অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে এমন চিত্র।
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, লা গুয়াইরার কিছু এলাকায় মানুষ খাবার ও পানির খোঁজে ছোটাছুটি করছেন। ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি। অনেক পরিবার শিশুদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এ ছাড়া ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেওয়া বাসিন্দারাও প্রায় ২৪ ঘণ্টা যাবত অভুক্ত।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় অক্ষত দোকানপাটের তালা ভেঙে ভেতরে লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন অনেকে। রয়টার্সের সাংবাদিকরা অন্তত দুটি দোকানে লুটপাটের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস-এর তথ্যানুযায়ী, স্থানীয় সময় বুধবার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকার এখন পর্যন্ত প্রায় ২৩৫ জনের মৃত্যু এবং চার হাজার ৩০০ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সমুদ্রসৈকতের জন্য পরিচিত শহর লা গুয়াইরা ও ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছের শহর মোরোন। সীমিত সরকারি সহায়তার মধ্যেই স্থানীয়রা মরিয়া হয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
লা গুয়াইরার বাসিন্দা কার্লোস বোরহেস বলেন, ‘আমরা যা পারছি তাই দিয়ে সাহায্য করছি। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট রয়েছে। একসময় বহুতল ভবন ছিল, এখন সেখানে কংক্রিটের বিশাল স্তূপ। সেগুলো সরাতে ব্যাকহো ধরনের ভারী যন্ত্রের প্রয়োজন।’
তিনি জানান, তাদের উদ্ধারকারী দল একটি ভবন থেকে তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করেছে। এ সময় ধ্বংসস্তূপের পাশে উদ্বিগ্ন স্বজনরা অপেক্ষা করছিলেন।
লা গুয়াইরার লস কোরালেস এলাকার বাসিন্দা আরহেনিস মার্তিনেস ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজ এক আত্মীয়কে খুঁজতে গিয়ে বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে কি ডাকা যায় না? সবাইকে আসতে হবে, সাহায্যে নামতে হবে। সাঁজোয়া যান নিয়ে আসুক, মানুষকে উদ্ধার করুক। যেখানে ট্রাক্টর পাওয়া যায়, সেখান থেকেই নিয়ে আসুক।’
লা গুয়াইরার অন্য কয়েকটি এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে এক শিশুকন্যাসহ দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। অন্যদিকে একটি ধসে পড়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবন থেকে আহত অবস্থায় এক মা ও তার দুই সন্তানকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাংবাদিকরা অন্তত একটি স্থানে সরকার-সমর্থিত মোটরসাইকেল আরোহী গোষ্ঠী ‘কোলেক্তিভোর’ সদস্যদের উদ্ধারকাজে অংশ নিতে দেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।
৫০ বছর বয়সী সুহাইল সারকুইস বলেন, ‘আমার ভবনে আর থাকা সম্ভব নয়। এখন আমার কিছুই নেই। শুধু আমি আর আমার ছেলে আছি। দেশে আমার আর কোনো আত্মীয় নেই। কয়েক মাস আগেই চাকরিটাও হারিয়েছি।’
এদিকে ভূমিকম্পের পরপরই গৃহস্থালির গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হলেও রাতের মধ্যে কয়েকটি ধ্বংসস্তূপে আগুন ধরে যায়। আতঙ্কিত বহু মানুষ, যাদের যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই, তারা রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের ভেতরে জীবিত কাউকে পাওয়া যায় কি না, তা খুঁজে দেখছেন।
সরকার জানিয়েছে, লা গুয়াইরাকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৫০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কাতার থেকে সহায়তা আসছে। একই সঙ্গে উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য ব্যাকহোসহ ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহে বেসরকারি খাতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
শহরের হোসে মারিয়া ভার্গাস হাসপাতাল আহত রোগীতে উপচে পড়ছে। অনেককে হাসপাতালের বাইরেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। পুলিশ হাসপাতালটিতে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি।
৬০ বছর বয়সী বিয়াত্রিস রদ্রিগেজ বলেন, ‘এটি এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। এক ভাতিজার দুই পা ভূমিকম্পে চাপা পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ায় হাসপাতালে কেটে ফেলতে হয়েছে। আর ছয় বছর বয়সী আরেক ভাতিজা মারা গেছে।’
সশস্ত্র বাহিনী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তারা লা গুয়াইরায় মাঠগুলোতে অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করছে, যেখানে জরুরি অস্ত্রোপচারও করা যাবে। বৃহস্পতিবার শহরের স্থানীয় স্টেডিয়ামের কাছে রয়টার্সের সাংবাদিকরা ত্রাণ সহায়তা নিয়ে সেনাবাহিনীর একটি বহরকে কাজ করতে দেখেছেন। অন্য এলাকাগুলোর হাসপাতালও একইভাবে চাপে রয়েছে।
মোরোনের একটি ছোট হাসপাতালে টানা ২৪ ঘণ্টার জরুরি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চিকিৎসক অগুস্তো রামিরেস জানান, প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট দেখা দিয়েছে।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, গজ, থার্মোমিটার, দস্তানা, প্লাস্টার, ব্যথানাশক—সবকিছুরই প্রয়োজন।’
তিনি জানান, আরও দুই চিকিৎসক এবং হাসপাতালের অন্য কর্মীরা ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ধসে পড়া ও বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মোরোন শহরে এ পর্যন্ত ১১২ জনের চিকিৎসা দিয়েছেন। তাদের হিসেবে মাথায় মারাত্মক আঘাতসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুতর জখমে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু রয়েছে।


