দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই নানা চাপ, সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রশাসনিক সমন্বয় সংকট, নতুন মন্ত্রীদের অভিজ্ঞতার অভাব এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিশ্চয়তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার এই প্রাথমিক ধাক্কা সামলে জনগণের আস্থা ধরে রাখাই এখন নতুন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৬ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসায় দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রশাসনে স্বচ্ছতা এবং দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রম শুরুর আশা ছিল জনগণের।
তবে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্দোলনের রাজনীতি আর রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতার মধ্যে যে বড় ফারাক রয়েছে, তা এখন স্পষ্ট হচ্ছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় অধিকাংশ সদস্যই নতুন মুখ, যারা এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় তাদের অনভিজ্ঞতার বিষয়টি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা তৈরি করেছে। অনেক মন্ত্রী এখনো নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম, প্রশাসনিক কাঠামো ও ফাইল ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেননি। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি তৈরি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে।
সরকার গঠনের পর মন্ত্রীদের জন্য ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এতে ছিল খাল খনন, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, কৃষিঋণের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মওকুফ এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মতো জনবান্ধব কর্মসূচি।
এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী নিজে নিয়মিত সচিবালয়ে বৈঠক করছেন এবং জেলা সফরের মাধ্যমে প্রশাসনকে নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এসব কর্মসূচির অগ্রগতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। কৃষকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, কৃষিঋণ মওকুফ কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। অনেক এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ চলছে বেশ ধীরগতিতে। অন্যদিকে খাল খনন ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ অনেক স্থানে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজার পরিস্থিতি। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বাজার তদারকির সরকারি ঘোষণার প্রভাব মাঠপর্যায়ে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈদেশিক ঋণের চাপ, রিজার্ভ সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকার এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতির অস্থিরতা। ব্যবসায়ী মহলের মতে, সরকার এখনো একটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ তুলে ধরতে পারেনি, যা বাজারের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও জনমনে পুরোপুরি উদ্বেগ কাটেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের মব সন্ত্রাস ও সহিংসতা কিছুটা কমলেও, মাঝেমধ্যেই সংঘবদ্ধ হামলা, চাঁদাবাজি ও হঠাৎ সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা সৃষ্টির প্রবণতা এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও এক ধরনের রূপান্তর ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে নতুন প্রশাসন। আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আগামী বছর থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে দেশের বর্তমান অবকাঠামো ও শিক্ষা প্রশাসনের সক্ষমতা বিবেচনা না করে এমন সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতেও বিভিন্ন এলাকায় সময়মতো হামের টিকা সরবরাহ না হওয়া এবং সরকারি হাসপাতালে ওষুধ সংকটের কারণে ক্ষোভ বাড়ছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, পূর্ববর্তী আমলের ঘাটতি কাটিয়ে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে এনে এখন টিকা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে নতুন সংসদ সদস্যদের সংসদীয় রীতিনীতির অনভিজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে। এর বিপরীতে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সংসদে বেশ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে এবং সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। আগামী ৭ জুন শুরু হতে যাওয়া সংসদের বাজেট অধিবেশনে ১১ জুন নতুন বাজেট পেশ করা হবে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ভর্তুকির চাপ এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে প্রণীত হতে যাওয়া এই বাজেটে যদি সাধারণ মানুষের ওপর নতুন কর বা অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ আসে, তবে তা জনঅসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।


