ভেনেজুয়েলায় পরপর আঘাত হানা শক্তিশালী দুই ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। গৃহহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ১৬ হাজার মানুষ।
ছয় দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে।
রাজধানী সংলগ্ন লস কোকোস এলাকায় উদ্ধারকারীরা ধসে পড়া ভবন গুলোতে এখনও জীবিত কাউকে পাওয়ার আশায় কাজ করছেন। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ থেকে একের পর এক মরদেহও উদ্ধার করা হচ্ছে।
লা গুইরা অঙ্গরাজ্যের মাকুতো শহরে ধসে পড়া নয়তলা ভবনের নিচে আটকে পড়া এক মা ও তার তিন সন্তানকে উদ্ধারের চেষ্টা টানা ৪০ ঘণ্টার বেশি চালানোর পর মঙ্গলবার ভোরে অভিযান স্থগিত করে ইকুয়েডর ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে তাদের কাছ থেকে আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ইকুয়েডরের গায়াকিলভিত্তিক ইকিউ-১১ উদ্ধার দলের প্রধান মেজর হোর্হে মনতেরো বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, জীবিত উদ্ধারের সময় ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। এখন ধ্বংসস্তূপে যা পাওয়া যাবে, তা সম্ভবত মরদেহ।
আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটি (আইআরসি) জানিয়েছে, ভূমিকম্পের ৭২ ঘণ্টার ‘গোল্ডেন আওয়ার’ পেরিয়ে যাওয়ার পরও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এই সময়ের পর জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা দ্রুত কমে যায়।
লা গুইরার অস্থায়ী মর্গে স্বজনদের অপেক্ষায় ছিলেন আন্দ্রেয়া মন্তিয়া। তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে তার ১৪ বছর বয়সী চাচাতো ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তবে ওই কিশোরের মা এখনও নিখোঁজ।
মর্গ এলাকায় সারি সারি খালি কফিন এবং বডি ব্যাগে মোড়ানো অসংখ্য মরদেহ দেখা গেছে। কর্মকর্তারা জানান, প্রতিনিয়ত মরদেহ আসায় শনাক্ত ও হস্তান্তরের কাজ অত্যন্ত চাপের মধ্যে চলছে।
ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোরে জর্ডানের উদ্ধারকারী দল একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছে। ষষ্ঠ দিনের উদ্ধার অভিযানে এটিই একমাত্র জীবিত উদ্ধারের খবর।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সংঘটিত ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুই ভূমিকম্পে প্রায় ৫৯ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। মহাকাশ থেকেও ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
অনেক এলাকায় এখনো পেশাদার উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। ফলে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের উদ্যোগে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত বা মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
জাতিসংঘের ভেনেজুয়েলাবিষয়ক আবাসিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা বলেন, ‘মৃতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা ১০ হাজার মরদেহ রাখার ব্যাগ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছি।’
তবে বিরোধী দল-সমর্থিত একটি ওয়েবসাইটের দাবি, এখনো প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পিডিভিএসএ ও বেসরকারি গ্যাস পরিবেশক ডোমেগাস রাজধানী কারাকাসের প্রায় ৬ লাখ গ্রাহকের গ্যাসলাইন পরীক্ষা করছে। ভূমিকম্পে সৃষ্ট সম্ভাব্য গ্যাস লিক শনাক্ত ও মেরামতে বিশেষ যন্ত্রপাতিও আনা হয়েছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করেছে, ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া মানুষ এখন খাদ্যসংকট ও সংক্রামক রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) আগামী তিন মাসে ৫ লাখ মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা দিতে ৫ কোটি ডলার তহবিল চেয়েছে। পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত হলে তারা ১০ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইতোমধ্যে লা গুইরায় ১ হাজার ২০০ মানুষের মধ্যে এক মাসের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ এবং অস্থায়ী খাদ্যকেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ভূমিকম্পে অন্তত তিনটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং আরও ছয়টি আংশিকভাবে অচল হয়ে পড়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু ও ইয়েলো ফিভারের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।
এদিকে ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় ৯০০-এর বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন করেছে। এছাড়া পুয়ের্তো রিকো ও কুরাসাওসহ ক্যারিবীয় অঞ্চলের ঘাঁটিগুলোতে আরও প্রায় ৮০০ সেনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।


