জুলাই আন্দোলনে নিহত-আহতদের পরিবারের সদস্যদের বিচার প্রাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক শ্রেণির অসাধু চক্রের ‘মামলা বাণিজ্য’ ও প্রতিহিংসার লড়াই। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে দেখা গেছে, দায়েরকৃত মামলার একটি বিশাল অংশই ভুয়া। এসব মামলায় মৃত ব্যক্তিকে বাদী সাজিয়ে কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে আসামি করা হয়েছে।
ন্যায়বিচারের এই পথ কলুষিত হওয়ায় এখন প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল হওয়ার এবং বিচার প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, থানা ও আদালতে সরাসরি করা অনেক মামলায় ভুয়া অভিযোগ এবং কাল্পনিক আসামিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালীন বিশাল সংখ্যক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের এখন মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মোট ২৭৩টি মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেছে পিবিআই। এর মধ্যে ১৬৩টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব মামলার ৬৩ শতাংশ বা ১০৩টি ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেও বাকি ৩৭ শতাংশ অর্থাৎ ৬০টি মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এর মধ্যে ১৪টি মামলা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রমাণ হয়েছে।
আদালতে সরাসরি করা সিআর মামলার ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। পিবিআইয়ের নমুনা হিসেবে নেওয়া ৮৪টি সিআর মামলায় মোট ৮ হাজার ২৩ জন আসামির মধ্যে ৬২ দশমিক ৭৯ শতাংশ বা ৫ হাজার জনই মিথ্যাভাবে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তদন্তে মাত্র ৩৭ দশমিক ২১ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এর ফলে চরম আইনি হয়রানির শিকার হচ্ছেন নিরপরাধ ব্যক্তিরা।
কাগজে কলমে অভিযোগ, বাস্তবে অস্তিত্বহীন
তদন্তে মিথ্যা প্রমাণ হওয়া ২২টি সিআর মামলা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এর মধ্যে ৭টি ঘটনাই ছিল সম্পূর্ণ সাজানো। ৬টি মামলায় বাদীর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং ৪টি মামলায় বাদীকে জোর করে মামলা করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ ছাড়া ব্যক্তিগত শত্রুতা ও পারিবারিক কলহের জেরে ৩টি এবং শিক্ষার্থী সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ২টি মামলা করা হয়েছিল।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ জানান, অনেক মামলা প্রকৃত হত্যাকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে হলেও একটি বড় অংশই ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, কিছু মামলার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। অনেক ক্ষেত্রে বাদীদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অথবা তাদের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনার কোনো মিল নেই। তদন্ত চলাকালেই বাদীরা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ২৮টি মামলা।
গাজীপুরের শ্রীপুর ফ্লাইওভারের কাছে আবু সাঈদ নামে একজনের মৃত্যুর ঘটনায় করা একটি মামলা এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬৭ জনকে আসামি করে মামলাটি করেছিলেন রফিকুল ইসলাম। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের সাব-ইন্সপেক্টর শাহ কামাল জানান, তদন্ত শুরুর পরপরই বাদী মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন। তদন্তে প্রমাণিত হয় যে পুরো মামলাটিই ছিল ভুয়া।
মৃত ব্যক্তি যখন বাদী
আশুলিয়া থানার একটি মামলায় দেখা গেছে, এক মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ১০৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ জানান, এনআইডি ডেটাবেজ যাচাই করে দেখা গেছে, যে ব্যক্তি বাদী সেজে মামলা করেছেন তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। এমনকি আসামিদের তথ্যেও ব্যাপক জালিয়াতি ধরা পড়েছে।
শহীদ পরিবারের ক্ষোভ
ভুয়া মামলার এই প্রবণতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। শহীদ আহনাফের মা জারদাজ পারভীন বলেন, ভুয়া মামলার কারণে আন্দোলনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তিনি নিরপরাধ কাউকে সাজা না দিয়ে প্রকৃত দোষীদের বিচার দাবি করেন।
শহীদ সায়েমের বাবা মাসুদ আহমেদ অভিযোগ করেন, কিছু মানুষ আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করছে। শহীদ রোহানের ভাই আলী আহমেদ মামলা গ্রহণের আগে আরও যাচাই-বাছাইয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও বিচারহীনতার ঝুঁকি
আইনজীবীরা বলছেন, এই মামলাগুলো আদালতে টিকবে না। আইনজীবী মোর্শেদ হোসেন শাহীন মনে করেন, হয়রানি, আর্থিক সুবিধা এবং প্রতিপক্ষকে এলাকা ছাড়া করার উদ্দেশ্যেই এসব মামলা হচ্ছে। অ্যাডভোকেট ফারজানা ইয়াসমিন রাখি বলেন, মিথ্যা মামলায় অনেক নিরপরাধ মানুষ মাসের পর মাস জেল খাটছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি ও মানবাধিকার আইনজীবী মঞ্জিল মোরসেদ বলেন, এক একটি ঘটনায় শত শত মানুষকে আসামি করা অবাস্তব। কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল পরিস্থিতিকে পুঁজি করে এমন করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকীও মনে করেন, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এসব ভুয়া মামলা দিয়েছে। তবে তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।


