ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। আবহাওয়া, পানির প্রাপ্যতা এবং শ্বাস নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বাতাসের উপস্থিতি একজন আটকে পড়া ভুক্তভোগীকে বেশ কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আহত ব্যক্তির আঘাত যদি গুরুতর না হয় এবং পরিবেশ অনুকূল থাকে, তাহলে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকা সম্ভব।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় গত বুধবার উত্তরাঞ্চলীয় লা গুইরা প্রদেশে ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এরপর থেকেই স্থানীয় জনগণ ও উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিতদের বের করে আনতে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ৭৭০টিরও বেশি ভবন পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে। এতে আরও প্রভাব ফেলেছে ভূমিকম্প পরবর্তী কম্পনগুলো (আফটার শক)।
কতক্ষণ বেঁচে থাকা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত কোনো বড় দুর্যোগের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অধিকাংশ উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে মরদেহ উদ্ধারের তুলনায় জীবিতদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। এরপর প্রতিটি দিন পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আটকে পড়াদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমতে থাকে। বেশিরভাগ ভুক্তভোগীই গুরুতর আহত অবস্থায় বা ধসে পড়া পাথর ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে থাকেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ ভিক্টর সাই বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিরা তখনই বেশি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা রাখেন, যখন তারা এমন কোনো ফাঁকা জায়গায় আশ্রয় নিতে পারেন যেখানে বড় ধরনের আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।’
বিশেষজ্ঞরা এই নিরাপদ স্থানকে ‘বেঁচে থাকার উপযোগী ফাঁকা জায়গা’ বলে থাকেন, যা ধ্বসে পড়া ভবনের নিচে আসবাবপত্র বা শক্ত কাঠামোর কারণে তৈরি হতে পারে।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি প্রতিক্রিয়া বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক জোসেফ বারবেরা বলেন, ‘ভবন ধসের ফলে আগুন, ধোঁয়া বা বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়লে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।’
‘সময় যত বাড়ে ততই বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস এবং পানির প্রাপ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খাবার ছাড়া হয়তো অনেকদিন বেঁচে থাকা সম্ভব, কিন্তু পানি ও অক্সিজেন ছাড়া বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব।’
‘ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়ার স্থানের তাপমাত্রাও বেঁচে থাকার সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলে, একই সঙ্গে বাইরের তাপমাত্রা উদ্ধার কার্যক্রমকেও প্রভাবিত করতে পারে।’
ভেনেজুয়েলা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দুই হাজার ৬০০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী সেখানে পৌঁছেছেন। তারা প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা লা গুইরায় রোববার উদ্ধার কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে বেশি সংগঠিত ছিল, যদিও স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম কয়েকদিনে ধীর প্রতিক্রিয়ার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় ধ্বংসস্তূপ থেকে সরানোর আগেই আহত ব্যক্তিকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। না হলে চাপা পড়ে থাকা পেশির ভাঙন থেকে তৈরি বিষাক্ত উপাদান উদ্ধার হওয়ার পর শরীরে শক তৈরি করতে পারে।
২০১১ সালের জাপানের ভূমিকম্প ও সুনামির পর এক কিশোর ও তার আশি বছর বয়সী দাদিকে তাদের ধসে পড়া বাড়ির নিচে থেকে নয় দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়। এর আগের বছর হাইতির পোর্ট-অ-প্রিন্সে ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে ১৫ দিন আটকে থাকার পর ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল।
ভূমিকম্পের সময় যা করতে হবে
বিশেষজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা নির্দেশনা ভিন্ন হতে পারে। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ভবনের নকশা সাধারণত ঝুঁকি কমানোর জন্য তৈরি করা হলেও সব জায়গায় তা সমানভাবে কার্যকর নয়।
যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে পরামর্শ দেওয়া হয়- যতক্ষণ না বাইরে বের হওয়ার সুযোগ থাকে, ভূমিকম্পের সময় নিচে নেমে যাওয়া, শক্ত কোনো আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং নিরাপদ অবস্থান ধরে রাখা উচিত। ভারী টেবিল বা শক্ত আসবাবের নিচে আশ্রয় নিলে ধসে পড়ার সময় একটি নিরাপদ ফাঁকা জায়গা তৈরি হতে পারে। ধুলো ও ধ্বংসাবশেষ থেকে রক্ষা পেতে মুখ কাপড় বা মাস্ক দিয়ে ঢেকে রাখা উচিত।
ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়লে শক্তি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। অপ্রয়োজনে শরীরের অতিরিক্ত পরিশ্রম না করা, খাদ্য ও পানি সাশ্রয় করে ব্যবহার করা, উদ্ধারকারীদের ডাক শুনতে কান পেতে থাকা এবং আশপাশে শব্দ করার জন্য কিছু খুঁজে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদি মোবাইল ফোন সঙ্গে থাকে, তাহলে ব্যাটারি সংরক্ষণ করে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করতে বলা হয়।


