উন্নত জীবনের স্বপ্নে ঘর ছেড়েছিলেন তারা। সেই স্বপ্নের পথেই থেমে গেল তাদের জীবন। লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার সময় পথ হারিয়ে নৌকায় মারা যাওয়া ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মধ্যে ১১ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর জেলায় নেমে এসেছে গভীর শোক। স্বজনদের কান্না আর হতাশার শব্দে ভারী হয়ে উঠেছে দিরাই, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজারের গ্রামগুলো। কেউ হারিয়েছেন সংসারের একমাত্র উপার্জনকারীকে, কেউবা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখা তরুণকে।
পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতরা হলেন, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে মাওলানা সাজিদুর রহমান (২৮), জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের ছালিকুর রহমানের ছেলে সোহানুর রহমান এহিয়া (২০), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে মেহেদী হাসান তায়েফ (১৮), রাজানগর ইউনিয়নের রন্নারচর গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া এলাকার ইজাজুল হক, একই এলাকার নাঈম আহমদ, আলী আহমদ, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান ও টিয়ারগাঁও গ্রামের সায়েক আহমেদ এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার আবু ফাহিম।
এ ঘটনায় দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫) মারা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও তার পরিবারের দাবি তিনি এখনো বেঁচে আছেন। এ ছাড়াও ওই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের আরজু মিয়ার ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, ‘আমরা স্থানীয় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যুর বিষয়টি জেনেছি। কিন্তু তারা যেহেতু বৈধপথে কোনো এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছিলেন না, তাই তাদের বিষয়ে সরকারি তথ্য নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট সবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছি যেন ভুক্তভোগী পরিবারদের খুঁজে বের করে এ সম্পর্কিত তথ্য নথিভুক্ত করেন। এর ফলে যারা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অবৈধপথে পাচার করছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।’
হতাহতদের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তবরুক বন্দর থেকে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে। ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় যাত্রা শুরু হলেও মাঝ সাগরে পথ হারিয়ে ফেলে নৌকাটি। টানা ছয় দিন ভাসতে থাকে সেটি। খাবার ও পানির সংকটে একসময় অসহায় হয়ে পড়েন যাত্রীরা। ক্লান্তি, ক্ষুধা ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় একে একে নিভে যায় প্রাণ। অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয় নৌকাতেই। পরে দালালদের নির্দেশে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। উদ্ধার হওয়া কয়েকজনকে গ্রিসের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নিহতদের পরিবারগুলোর অভিযোগ, দালালচক্রের মিথ্যা আশ্বাসে পড়ে তারা এই বিপজ্জনক পথে পা বাড়ান। প্রথমে কম টাকার প্রলোভন দেখানো হলেও পরে ধাপে ধাপে বাড়ানো হয় খরচ। অনেক ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
জগন্নাথপুরের টিয়ারগাঁও গ্রামের সায়েক আহমদের পরিবার জানায়, সায়েককে লিবিয়ায় কয়েক মাস আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না, ফোনে তিনি বারবার কষ্টের কথা জানাতেন। ছোট সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার আশাতেই তিনি বিদেশযাত্রার ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
সায়েকের স্ত্রী বলেন, ‘অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করছি। দালাল কইছিল দ্রুত পাঠাই দিব। কিন্তু চার মাস আটকে রাখছে। এখন আমার সন্তান বাবাহীন।’
দিরাই উপজেলার নুরুজ্জামান সরদার ময়নার পরিবারেও শোকের ছায়া। বাবার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই তিনি ইউরোপের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। নুরুজ্জামানের বাবা আবু সর্দার বলেন, ‘আমি অনেকবার না করছি। কিন্তু সে শোনেনি। এখন আমার ছেলেকে আর ফেরত পাব না।’
তার বড় ভাই হেলাল সর্দার জানান, সর্বশেষ ২২ মার্চ কথা হয়েছিল নুরুজ্জামানের সঙ্গে। সেদিন তিনি জানিয়েছিলেন নৌকায় উঠবেন। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। পরে সহযাত্রীর কাছ থেকেই তার মৃত্যুর খবর পান পরিবার।
এই ঘটনার পরও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেক পরিবার। দিরাই উপজেলার আব্দুল্লাহ আল মামুন এখনো নিখোঁজ। তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়েও কোনো তথ্য পাননি। মামুনের এক স্বজন বলেন, ‘সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে-কিছুই জানি না। শুধু অপেক্ষা করছি।’
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রিসে বাংলাদেশ মিশন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সহায়তায় জীবিতদের সহায়তা ও মরদেহ ফেরানোর চেষ্টা চলছে।


