জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় আরও ১০৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকল্পটির মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৬১৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
২০২৪ সালের আগস্টে ভারতীয় ঠিকাদারের দেশত্যাগ, ঋণ ছাড়ে বিলম্ব এবং বন্যার কারণ দেখিয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদনও করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে অনুমোদিত এই প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। পরে তা বাড়িয়ে ২০২৫ সালের অক্টোবর করা হলেও এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৫৬ শতাংশ, আর আর্থিক অগ্রগতি ৩৮ শতাংশ।
নতুন করে মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও বর্তমান দখলদারদের জমি থেকে এখনো সরানো না যাওয়ায় এই সময়েও কাজ শেষ হওয়া নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।
কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ অবশ্য ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবে এতে নাখোশ। একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরে তারা জানিয়েছে, ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশের (ইজিসিবি) বাস্তবায়নাধীন সোনাগাজী ২২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। সেখানে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন মাদারগঞ্জের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্যই প্রস্তাবিত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৬১৩ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ, দ্বিগুণ ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে যেখানে প্রায় কাছাকাছি খরচ হচ্ছে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কেন এত বিপুল ব্যয় হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করতে আরপিসিএলকে নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্প সংশোধনের কারণ ব্যাখ্যা করে আরপিসিএল জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর গত ৩ আগস্ট ভারতীয় ইপিসি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এবং স্থানীয় সাব-কন্ট্রাক্টররা প্রকল্প এলাকা ত্যাগ করেন। ফলে কাজ পুনরায় শুরু করতেই প্রায় চার মাস সময় লেগে যায়।
ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত চার মাস ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ বন্ধ থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় বলেও ব্যাখ্যায় বলা হয়। একই সময়ে বন্যার কারণে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের কাজও পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং একেও বিলম্বের একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে সংস্থাটি ডলারের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করেছে। তারা জানায়, মূল ডিপিপি ও প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। কিন্তু বর্তমানে ঋণচুক্তি (এসএলএ) অনুযায়ী প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকা ৫০ পয়সা বিবেচনায় নেওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাজনিত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির বিভিন্ন ব্যয় খাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ৪৭ কিলোমিটার ১৩২ কেভি ট্রান্সমিশন লাইনে ২৩ দশমিক ৫০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য পূর্ত কাজের ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন। কমিশন আরও বলেছে, ফুয়েল অ্যান্ড গ্যাস ফর কুকিং খাতের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট নয়।
যানবাহন ভাড়া খাত থাকা সত্ত্বেও নতুন যানবাহন কেনার প্রস্তাব এবং সংশ্লিষ্ট মেরামত ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরামর্শক খাতে নতুন করে ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে কমিশন।
এ বিষয়ে আরপিসিএলের নির্বাহী পরিচালক (পিএন্ডডি) কে এম নঈম খান টাইমসকে বলেন, ‘প্রকল্প গ্রহণের সময়ের তুলনায় এখন ডলারের দাম অনেক বেড়েছে। এ কারণেই প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।’
প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতীয় কোম্পানির কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তারাই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ভারতীয় ঋণের শর্ত অনুযায়ী তাদের ঠিকাদার দিয়েই কাজ করতে হয়। পরে তারা আবার ফিরে এসে কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া, ঋণ ছাড়ে দেরিসহ আরও কিছু কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে।’
ফুয়েল অ্যান্ড গ্যাস ফর কুকিং খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকা কর্মকর্তাদের রান্নার কাজে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের জন্য এই খাতে অর্থ প্রস্তাব করা হয়েছে।’
পরামর্শক খাতে অতিরিক্ত ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি নতুন ব্যয় নয়, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংশোধিত হিসাব এসেছে।’
তবে আগের বরাদ্দ কত ছিল, তা তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি।


