চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রসালো লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, জেলায় এবার ২ হাজার টন লিচু উৎপাদিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
চাষিরা জানান, অনুকূল আবহাওয়া এবং লিচু পাকার সময়ে ঝড়-বৃষ্টির তাণ্ডব কম থাকায় এবার ফলন অনেক ভালো হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলা জুড়ে এবার ৬৫০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫৫৫ হেক্টর জমির লিচু সংগ্রহ করা হয়েছে। মূলত সীমান্তবর্তী বিজয়নগর, আখাউড়া ও কসবা উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে বেশি হয়েছে এই চাষাবাদ। এর মধ্যে শুধু বিজয়নগর উপজেলাতেই ৪৫০ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়েছে।
মিষ্টি ও রসালো লিচুর জন্য দেশজুড়ে পরিচিত বিজয়নগর উপজেলা। এখানকার পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, কাশিমপুর, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, কালাছড়া, মেরাশানি, কামাল মোড়া, নূরপুর, হরষপুর, ধর্মনাল, মুকুন্দপুর, সেজামুড়া, নোয়াগাঁও, আলিপুর, চাঁদপুর, কাশীনগর, চাতুরপুর, রূপা, শান্তামোড়া, কামালপুর, কচুয়ামোড়া, ভিটি দাউদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার এক হাজারেরও বেশি বাগানে লিচুর চাষ হয়। লিচু চাষ লাভজনক হওয়ায় এখন অনেক চাষি তাদের ধানি জমিকে লিচু বাগানে রূপান্তর করছেন।
স্থানীয় লিচু চাষি রফিকুল ইসলাম হেলাল জানান, এলাকায় পাটনাই, বোম্বাই, চায়না-৩ এবং এলাচি জাতের লিচু চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে এলাচি এবং চায়না-৩ জাতের লিচুর আকার বেশ বড় হয়। তিনি আরও জানান, সস্তা সার ও কীটনাশকের সহজলভ্যতার পাশাপাশি ভালো আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন অনেক বেড়েছে। তবে ঈদের আগে টানা কয়েকদিনের বৃষ্টির কারণে প্রায় ২০ শতাংশ লিচু ফেটে গেছে বা ঝরে পড়েছে, যা চাষিদের কিছুটা লোকসানের মুখে ফেলেছে।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের লিচু এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে এলেও বিজয়নগরের লিচু সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে আসে। পাহাড়পুর ইউনিয়নের আউলিয়া বাজার এই উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচুর আড়ত।
লিচু চাষি নাসির উদ্দিন জানান, এই বাজারে প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৮টার মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকার লিচু কেনাবেচা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নরসিংদী, ভৈরব, নোয়াখালী, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, ফেনী ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এখান থেকে লিচু কিনে দেশজুড়ে সরবরাহ করেন।
লিচু বাগানের কারণে এখন একটি অস্থায়ী পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বিজয়নগর। জেলা শহর এবং দূর-দূরান্তের ঢাকা থেকে দর্শনার্থীরা এখানকার মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে এবং তরতাজা ফল কিনতে বাগানগুলোতে ভিড় করছেন।
বর্তমানে বাগানগুলোতে প্রতি একশ চায়না-৩ লিচু ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে বোম্বাই জাতের লিচু প্রতি একশ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। ঢাকা থেকে আসা টিপু সুলতান নামে এক দর্শনার্থী বলেন, তিনি রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাগান থেকে এক হাজার লিচু কিনেছেন।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম জানান, কৃষি বিভাগ বাগান মালিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান ও তদারকি করছে, যাতে লিচুতে কোনো ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার করা না হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোস্তফা ইমরান হোসেন জানান, মাটির গুণাগুণ ভালো হওয়ার কারণে এবার লিচুর ফলন প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের উৎপাদিত লিচুর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।


