ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চলতি মৌসুমে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ কম থাকা এবং পরিচর্যার কারণে জেলার বাগানগুলোতে ভালো ফলন পেয়েছেন চাষিরা।
তবে ঈদুল আজহার আগে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে লিচু ফেটে যাওয়া ও ঝরে পড়ায় শেষ সময়ে কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। তারপরও প্রায় ২ হাজার টন লিচু উৎপাদন এবং ৩০ কোটি টাকার বিক্রির আশা করছে কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে বিভিন্ন লিচু বাগান ঘুরে দেখা যায়, জেলার সীমান্তবর্তী বিজয়নগর, আখাউড়া ও কসবা উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপকভাবে লিচুর চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে বিজয়নগর উপজেলায়, যেখানে প্রায় সাড়ে ৪০০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে।
বিজয়নগরের পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, খাটিঙ্গা, কাশিমপুর, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, কালাছড়া, মেরাসানী, নূরপুর, হরষপুর, মুকুন্দপুর, নোয়াগাঁও, অলিপুর, কাশিনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে শত শত লিচুর বাগান। লিচু চাষ লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষক এখন ধানের জমিতেও লিচুর আবাদ করছেন।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে লিচু বাজারে এলেও বিজয়নগরের লিচু বাজারে আসে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে। এখানকার মিষ্টি ও রসালো লিচুর সুনাম থাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও কুমিল্লা, নরসিংদী, ভৈরব, নোয়াখালী, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, ফেনী এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা বাগান থেকে লিচু কিনে নিয়ে যান।

লিচুচাষি নাছির উদ্দীন জানান, উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার পাহাড়পুর ইউনিয়নের আউলিয়া বাজার। সেখানে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার লিচু বেচাকেনা হয়। ভোর থেকেই চাষি ও বাগান মালিকরা লিচু নিয়ে বাজারে আসেন এবং সকাল আটটার মধ্যেই অধিকাংশ লেনদেন শেষ হয়ে যায়।
আরেক চাষি রফিকুল ইসলাম হেলাল বলেন, ‘বিজয়নগরে পাটনাই, বোম্বাই, চায়না থ্রি ও এলাচি জাতের লিচুর চাষ হয়। এ বছর ফলন ভালো হলেও ঈদের আগে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে প্রায় ২০ শতাংশ লিচু ফেটে যায় এবং ঝরে পড়ে। এতে চাষিদের কিছুটা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আলী হোসেন জানান, লিচুর মৌসুমে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী বাগান দেখতে আসছেন। অনেকেই বাগান থেকেই লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে চায়না থ্রি জাতের প্রতি ১০০ লিচু ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং বোম্বাই জাতের লিচু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লিচুর বাগানগুলোকে ঘিরে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন জেলা শহরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা বাগান দেখতে আসছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরছেন, আবার কেউ বাগান থেকেই লিচু সংগ্রহ করছেন।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা টিপু সুলতান বলেন, “প্রতিবছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজয়নগরের লিচুবাগানের ছবি দেখি। এবার বন্ধুদের নিয়ে এসেছি। বাগান দেখে খুব ভালো লেগেছে। এক হাজার লিচু কিনে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছি।”
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম জানান, বিজয়নগরে দেশি, এলাচি, চায়না, পাটনাই ও বোম্বাই জাতের লিচুর আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগ নিয়মিত বাগান মালিকদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। তবে মৌসুমের শেষ দিকে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে লিচু ফেটে ও ঝরে যাওয়ায় কিছু ক্ষতি হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মোস্তফা এমরান হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ৫৫৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে। ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ বছর প্রায় ২ হাজার টন লিচু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।


