ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে ‘সামাজিক বিচারের’ নামে প্রকাশ্য দিবালোকে এক ব্যক্তিকে হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটানোর ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার উপজেলার নারুই গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নির্যাতনের এই ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ‘মব জাস্টিস’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নির্যাতনের শিকার ওই ব্যক্তির নাম হবি মিয়া। তার বিরুদ্ধে এলাকায় ইয়াবা বিক্রির অভিযোগে মাদকের মামলা রয়েছে।
নবীনগর থানার শিবপুর পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. নূর নবী টাইমস অব বাংলাদেশকে করে জানান, ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। তবে তারা পৌঁছানোর আগে নির্যাতনকারীরা চলে যায় এবং পরে ভুক্তভোগীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা না হওয়ায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘স্থানীয় বাসিন্দা মোকাররম, মোহসিন, তাজু ও হানিফ মেম্বারসহ আরও কয়েকজন মিলে হবি মিয়াকে নির্যাতন করেন। ঘটনার সময় সেখানে ভুক্তভোগীর স্ত্রী ও মা-ও উপস্থিত ছিলেন।’
ভিডিওতে যা দেখা গেছে
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৩২ মিনিট ও দেড় ঘণ্টার দুটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বাজারে বিচারের নামে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। এরপর হবি মিয়ার চোখ গামছা দিয়ে এবং দুই হাত রশি দিয়ে বাঁধা হয়। হাত-পায়ের মাঝখান দিয়ে পাইপ ঢুকিয়ে তাকে সম্পূর্ণ অবশ করে মাটিতে ফেলে রাখা হয়।
পরে উল্টো করে পা ওপরে তুলে রশি দিয়ে বেঁধে দুজন ধরে রাখেন এবং আরেকজন লাঠি দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকেন। মারধরের সময় তার কাছে টাকা চাওয়ার শব্দ শোনা যায়।
ওই সময় হবি মিয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘কাউরে টাকা দেই নাই। আল্লাহ মাফ করো…।’ ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা গ্রামের সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ভিডিওটি সবাই শেয়ার করেন। জনসম্মুখে তার বিচার হবে।’
দেশজুড়ে মব কালচারের বিস্তার
নবীনগরের এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। গত কয়েক সপ্তাহেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্দেহভাজন অপরাধীদের গণপিটুনি দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে ঝিনাইদহে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে বিল্লাল হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে গণধোলাই দেওয়া হলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে গত ১০ মে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গরু চুরির সন্দেহে তিনজনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করে গ্রামবাসী।
কেবল শারীরিক নির্যাতনই নয়, সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনীও একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর চাপের মুখে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আয়োজকদের দাবি, প্রশাসন কার্যত জনচাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মে মাসেই দেশে ‘মব সহিংসতায়’ অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন।
এসব ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না।’ তবে বাস্তবে মব সহিংসতা বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মানবাধিকারকর্মী আলমগীর সুজন বলেন, ‘দেশে যেভাবে মব জাস্টিসের ঘটনা বাড়ছে–মাজারে হামলা থেকে শুরু করে প্রকাশ্য নির্যাতন পর্যন্ত–তা কেবল চলমান বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই উসকে দিচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রের সংবিধান ও প্রচলিত আইনেরও সরাসরি লঙ্ঘন। একটি ঘটনা আবার নতুন নতুন মব জাস্টিসের জন্ম দিচ্ছে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। সেই ব্যক্তি অপরাধী কি না, সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব একমাত্র আদালতের।’
মনজিল মোরসেদের মতে, আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় নিজেরাই বিচার করার বিপজ্জনক প্রবণতা বাড়ছে। জনগণকে বিশ্বাস করাতে হবে যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থা অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে সক্ষম।
ফেসবুকে এই নির্যাতনের ভিডিওর নিচে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি অতীতে ‘ক্রসফায়ার’-এর উদাহরণ টেনে বলেন, ‘সমাজে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে মানুষ অনেক সময় আইনবহির্ভূত ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। শুরুতে মানুষ বাহবা দিলেও পরে যখন এর অপব্যবহার সামনে আসে, তখনই জনমত বদলে যায়।’


