আগামী সোমবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের শেষ ১৬-এর হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে নরওয়ে। তবে এই মহামঞ্চে নামার আগে নরওয়ে শিবিরের ঘুম কেড়ে নিয়েছে একটিই বড় প্রশ্ন–দলের প্রধান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড কি সঠিক সময়ে পুরোপুরি চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারবেন?
গত ৩০ জুন আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে ম্যাচের ৮৬তম মিনিটে জয়সূচক গোল করে নরওয়েকে শেষ ষোলোতে তুলেছিলেন এই তারকা স্ট্রাইকার। তবে ম্যাচ শেষে অকপটে স্বীকার করেন, তিনি ‘মরণক্লান্ত’ হয়ে পড়েছিলেন। ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে তার পক্ষে মাঠে টিকে থাকা অসম্ভব হতো।
প্রধান কোচ স্টেল সোলবাকেনও উদ্বেগ বাড়িয়ে জানিয়েছেন, দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই হালান্ড তার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে লড়ছিলেন। ব্রাজিলের মতো মহাশক্তির বিরুদ্ধে নামার আগে দলের সেরা অস্ত্রের এমন ‘ব্যাটারি লো’ দশা নিশ্চিতভাবেই ভাবিয়ে তুলছে নর্ডিক দেশটিকে।
ফ্রান্সের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হালান্ড এবং অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড দুজনকে বিশ্রামে রাখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল নকআউটের জন্য শক্তি জমিয়ে রাখা। তবে দীর্ঘ ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ইউরোপীয় ক্লাব মৌসুমের ধকল আর মানসিক চাপের কারণে সেই সামান্য বিশ্রাম এই দুই তারকার শরীরের ক্লান্তি পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।
ইউএই প্রো লীগের ক্লাব আল নাসরের সঙ্গে যুক্ত প্রখ্যাত স্পোর্টস ফিজিওলজিস্ট ডম রে নরওয়ের মেডিকেল স্টাফদের এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলেন, ‘খেলোয়াড়দের শরীরে গত এক-দুই মৌসুম ধরে যে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা ক্রনিক স্ট্রেস জমা হয়েছে, তা হুট করে দূর করা সম্ভব নয়। তবে কিক-অফের আগে তাদের শরীরকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সতেজ করে তোলা সম্ভব।’
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচের পর ব্রাজিল লড়াইয়ের আগে নরওয়ে সময় পাচ্ছে পাঁচ দিন, যেখানে ব্রাজিল পাচ্ছে ছয় দিন। তবে ডম রে মনে করেন, এই এক দিন কম সময় পাওয়াটাই উল্টো নরওয়ের পক্ষে কাজ করতে পারে।
ক্রীড়া বিজ্ঞানের পরিভাষায়, ম্যাচের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর ক্লান্তি সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছালেও, ৯৬ ঘণ্টা অর্থাৎ পঞ্চম দিনে শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে। ডম রের মতে, ‘সময়টা যখন পাঁচ বা ছয় দিন হয়ে যায়, তখন কৌশল সাজানো জটিল হয়। বেশি কঠোর অনুশীলনও করা যায় না, আবার হাত গুটিয়ে বসে থাকার জন্যও সময়টা অনেক দীর্ঘ। তাই আমি ব্রাজিলের ছয় দিনের চেয়ে নরওয়ের পাঁচ দিনের বিরতিটাকেই এগিয়ে রাখব।’
ইরাকের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচের পর নরওয়ে ফুটবলারদের নিউইয়র্ক শহর ঘুরে দেখার অনুমতি দিয়েছিলেন কোচ সোলবাকেন। শারীরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ক্লান্তিকর মনে হলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটিকে দারুণ দাওয়াই বলছেন ডম রে। তার মতে, খেলোয়াড়রা মানসিকভাবে ফুরফুরে থাকলে শরীর দ্রুত রিকভার করে।
চলতি বিশ্বকাপে তীব্র গরমের কারণে হাইড্রেশন ব্রেকের যারা সমালোচনা করছেন, তাদের দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন এই ফিজিওলজিস্ট। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় শরীর থেকে ইলেক্ট্রোলাইট ও সুগার বের হয়ে যাওয়ায় এই ব্রেকগুলোকে যারা কেবল পানি পানের সময় না ভেবে পারফরম্যান্সের অংশ হিসেবে দেখবে, তারা মাঠের খেলায় বাড়তি সুবিধা পাবে।
ইতিহাসের পাতায় ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ের রেকর্ড অবশ্য চোখ কপালে তোলার মতো। সেলেসাওদের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচ হারেনি তারা। যার মধ্যে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ২-১ গোলের জয়টি অন্যতম। আগামী সোমবারেও মেটলাইফের মাঠে আন্ডারডগ হিসেবে নামলেও নরওয়ের হারানোর কিছু নেই। এখন দেখার বিষয়, অতীতের অপরাজেয় রেকর্ড ধরে রাখতে হালান্ডের ক্লান্তি ঝেড়ে নরওয়ে কতটা গর্জে উঠতে পারে।


