বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে একজন ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে সরকারের বার্তা কী-তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটি বলেছে, স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে টিআইবি এ উদ্বেগ জানায়।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নবনিযুক্ত গভর্নরের ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞতা মূলত ঋণগ্রস্ততা, ঋণখেলাপি অবস্থা এবং বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পাশাপাশি তিনি তৈরি পোশাক শিল্প, আবাসন খাত, অ্যাটাব ও ঢাকা চেম্বারের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলে বিপর্যস্ত ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে একজন ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ী, যিনি বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধাভোগী এবং বিভিন্ন খাতে নীতিদখলের সুবিধা পেয়েছেন-তিনি কি ব্যবসায়ী লবি ও ঋণখেলাপি মহলের প্রভাবমুক্ত থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবেন, প্রশ্ন তোলেন তিনি।
টিআইবি আরও বলেছে, বর্তমান সংসদের প্রায় ৬০ শতাংশ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদের ৬২ শতাংশের মূল পেশা ব্যবসা। সংসদ সদস্যদের প্রায় অর্ধেক ঋণগ্রস্ত, যাদের মোট আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর করা ব্যাংক খাতের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা সরকারকে বিবেচনা করতে হবে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ঋণখেলাপিনির্ভর ব্যবসায়ী লবির প্রভাবাধীন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলো।
তিনি আরও বলেন, সদ্য ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া কতটা বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাতে সুশাসন, শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছিল। এই নিয়োগ সেই অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে।
টিআইবি বলেছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণসহ বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এমন সময়ে এই নিয়োগ কতটা ফলপ্রসূ হবে এবং ব্যাংকিং খাতে সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য ইতোমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপগুলো কতটা বাস্তবায়িত হবে-তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
সংস্থাটি প্রশ্ন রেখেছে, ব্যবসায়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নতুন গভর্নর কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার বাস্তবায়নে নতুন গভর্নরের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দলীয় ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী স্বার্থের বাইরে থেকে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।


