গত রোববার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ইন্টারপোলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার এই সাবেক পুলিশ প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আরবি অনুবাদের কাজ তদারকি করছে। এই অনুবাদ সম্পন্ন হওয়ার পর বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজ করতে দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে।
পুলিশ এবং দুদকের কর্মকর্তারা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। আশা করা হচ্ছে, বুধ বা বৃহস্পতিবারের মধ্যে অনুবাদ করা পরোয়ানাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। সেখান থেকে মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা এই অনুরোধপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে দুবাইয়ের কনস্যুলার অফিস অথবা সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
দুদকের মামলার ওপর কৌশলগত নির্ভরতা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ১৭টি হত্যা মামলায় বেনজীর আহমেদকে ‘আদেশদাতা ব্যক্তি’ হিসেবে এজাহারভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালের হেফাজত-এ-ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে ১০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার জন্য সরকার কৌশলগতভাবে দুদকের মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপি ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, ‘গণ-আসামি’ সংশ্লিষ্ট হত্যা এবং মানবাধিকার মামলাগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের কাছ থেকে সমালোচনার মুখে পড়েছে। তারা এর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ কারণে সরকার মনে করছে, দুদকের দুর্নীতির অভিযোগগুলো বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার জন্য আরও জোরালো এবং কম বিতর্কিত আইনি ভিত্তি তৈরি করবে।
বেনজীর বর্তমানে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার এবং পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের দায়ের করা ছয়টি মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের একটি মামলার বিচার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এ চলমান এই মামলায় বাদীসহ পাঁচজন সাক্ষী ইতোমধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আগামী ২৩ জুন পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে আদালত।
দুদকের তদন্তে দেখা গেছে, বেনজীর ১২ কোটি ১৯ লাখ টাকার সম্পদ ঘোষণা করলেও (যার মধ্যে ৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি) তার মোট সম্পদের পরিমাণ পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। তার বৈধ আয় এবং ব্যয় হিসাব করলে তার সঞ্চয় হওয়ার কথা ছিল মাত্র ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অর্থ পাচার
সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক উপায়ে পাসপোর্ট নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দুদকের দায়ের করা একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারের মতো উচ্চপদে থাকা সত্ত্বেও, বেনজীর বিভাগীয় অনাপত্তি পত্রের (এনওসি) বাধ্যবাধকতা এড়াতে নিজেকে একটি বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়ের করা একটি অর্থ পাচার মামলায় অভিযোগ করা হয়, বেনজীর দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগে নগদ ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা উত্তোলন করেন, যার মাধ্যমে তিনি কার্যকরভাবে এই অর্থের উৎস ও অবস্থান গোপন করেন। দুদকের তদন্তে আরও জানা গেছে, সম্পদ অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) হওয়ার আগেই নগদ টাকা তুলে নেওয়ার জন্য বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যরা ২০২৪ সালে বেশ কয়েকটি স্থায়ী আমানত বা এফডিআর মেয়াদপূর্তির আগেই নগদায়ন করেছিলেন।
সাবেক এই পুলিশ প্রধানের পরিবারের সদস্যরাও এই আর্থিক অপরাধের সাথে জড়িত। তার স্ত্রী জিশান মির্জা ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে অভিযুক্ত। তার কন্যা ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর এবং তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর যথাক্রমে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের মুখোমুখি হচ্ছেন।
দুদকের দাবি, বেনজীরের প্রভাব খাটিয়ে এই সম্পদ অর্জন করা হয়েছিল। এ কারণে এই মামলাগুলোতে তাকে সহায়তাকারী আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দুদকের কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন উল্লেখ করেন, এই পরিবারের সম্পদের বিষয়ে সামগ্রিক তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।
ফৌজদারি মামলা ও অন্যান্য অভিযোগ
আর্থিক অপরাধের বাইরেও বেনজীর হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত এক ডজনেরও বেশি মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবন বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা এবং ২০১৩ সালের নভেম্বরে মৎস্য ভবন মোড়ে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় তার ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া মিরপুর মডেল থানা, উত্তরা পশ্চিম থানা এবং বগুড়ার শিবগঞ্জ থানায় দায়ের করা গুম ও হত্যার মামলাতেও তার নাম রয়েছে।
ইন্টারপোলের মাধ্যমে দুবাই থেকে সন্দেহভাজন আসামিদের ফিরিয়ে আনার সফল দৃষ্টান্তও আছে। শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার প্রধান আসামি আরিফ সরকারকে গত ৬ মে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। নরসিংদীর পিবিআই পুলিশ সুপার এস এম ফরহাদ হোসেন জানান, ওই মামলার আরেক আসামি মহসিন মিয়াকেও ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
তবে এই প্রক্রিয়াটি চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। ২০১৯ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ওরফে মন্টিকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, যখন জানা যায় সে আলী আকবর চৌধুরী নামে একটি ভারতীয় পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছিল।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী বেনজীর আহমেদেরও একটি বিদেশি পাসপোর্ট থাকতে পারে, এমনটি বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য আইনি জটিলতা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।


