ভোটে ডিজিটালাইজেশনের নামে প্রকল্প নিয়ে অর্থ অপচয় যেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দীর্ঘদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে প্রযুক্তিনির্ভর নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয় না। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও ব্যর্থ অ্যাপের পেছনে নষ্ট হয় জনগণের বিপুল অর্থ।
বিতর্কিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) অধ্যায়ের ইতি টেনে ইসি ইতোমধ্যেই প্রযুক্তিটি বাতিল করেছে। ফলে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে কেনা ইভিএম এখন নানা গোডাউনে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
কেন্দ্র থেকে দ্রুত ভোটের ফল পাঠানোর জন্য ৪২ কোটি টাকায় কেনা ট্যাব নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। প্রার্থী মনোনয়ন অনলাইনে জমা এবং ভোটের হার জানাতে ২১ কোটি টাকায় তৈরি স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপও কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ প্রবাসী ভোটারদের জন্য নেওয়া ৪৯ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যয়ের খাত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রকল্পে ৩০ জন পরামর্শক পাচ্ছেন ১৫ কোটি টাকার বেশি, যা পুরো প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
গোডাউনে নষ্ট হচ্ছে ইভিএম
তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ ইভিএম কেনে কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। বিপুল ব্যয়ে যন্ত্রটি কেনা হলেও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে ব্যবহার করা হয়। পরবর্তীতে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করলেও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনেও যন্ত্রটি ব্যবহার করেনি।
বর্তমান এএমএম নাসির উদ্দিন কমিশনও ভোটে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আইন সংশোধন করে প্রযুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেছে। বিভিন্ন গোডাউনে ইভিএম রাখা হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। বাতিল হওয়া এই যন্ত্র সংরক্ষণে প্রতি বছর ব্যয় হচ্ছে কোটি টাকা।
একই প্রকল্পের মাধ্যমে ৪২ কোটি টাকায় কেনা স্মার্টকার্ড প্রি-পারসোনালাইজেশন অ্যান্ড পারসোনালাইজেশন সিস্টেমও পরিণত হয়েছে ভাঙারিতে। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে যন্ত্রটি বুঝে নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। ইভিএম বাতিলের পর যন্ত্রটি এখন অযত্নে নির্বাচন ভবনের বেসমেন্টে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। এটি চালানোর মতো প্রশিক্ষিত জনবলও ইসিতে নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইভিএম প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় মেশিনগুলো নির্বাচন কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে; ভবিষ্যতে এ যন্ত্রের কী হবে-তা অনিশ্চিত।
ব্যবহার ছাড়াই নষ্ট ৪২ হাজার ২০০ ট্যাব
নির্বাচনের ফল দ্রুত পাঠানোর জন্য ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪২ হাজার ২০০টি ট্যাব কিনেছিল কে এম নূরুল হুদা কমিশন। তিন বছরের গ্যারান্টি থাকা এসব ট্যাবের বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে।
ইসির কর্মকর্তারা জানান, মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রায় সব ট্যাবের ব্যাটারি ফুলে গেছে, চার্জ থাকে না। ডিজিটালি তথ্য পাঠানোর জন্য কেনা এসব ট্যাব কোনো নির্বাচনে কাজে আসেনি। সরবরাহের পরই বহু ট্যাবে ত্রুটি ধরা পড়ে, নিম্নমানের হওয়ায় দ্রুত বিকল হয়ে পড়ে যন্ত্রগুলো। এসব ট্যাব নির্বাচনের জন্য তেমন কোনো কাজে আসেনি বলেও জানান কর্মকর্তারা।
কাজে আসেনি ২১ কোটি টাকার অ্যাপ
মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে সংঘর্ষ এড়াতে এবং ভোটের সর্বশেষ আপডেটসহ বিভিন্ন তথ্য মানুষকে জানাতে ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা ও স্মার্ট নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা অ্যাপ তৈরি করে কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনলাইনে মাত্র ২১টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এ ছাড়া দুই ঘণ্টাব্যাপী ভোটের আপডেট দেওয়ার কথা বলা হলেও ভোটের মাঝপথে অকার্যকর হয়ে পড়ে অ্যাপটি। বর্তমান কমিশন অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান বাতিল করেছে। এ ছাড়া, অ্যাপের মাধ্যমে ভোটের সর্বশেষ তথ্য প্রদান করার বিষয়েও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ বিষয়ে ইসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অনুবিভাগের সিস্টেম ম্যানেজার মো. রফিকুল হক বলেন, অ্যাপটির মধ্যে এবার প্রিজাইডিং অফিসারদের তালিকা থাকবে। এতে সহজেই তাদের তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তা জানতে পারবে। তবে ভোটের আপডেট পাওয়া যাবে কি না কমিশন থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
৪৯ কোটি টাকা প্রকল্পের ১৫ কোটি পরামর্শকের পকেটে
প্রবাসী ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে দেশের বাইরে ভোটদান সিস্টেম উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন শীর্ষক ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে নাসির উদ্দিন কমিশন। এই প্রকল্পের আওতায় ৩০ জন পরামর্শকের জন্য ১৫ কোটি ৬৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই পরামর্শকরা ২৩ মাস কাজ করে এ অর্থ গ্রহণ করবেন, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৩১.৭২ শতাংশ। এ ছাড়া প্রকল্পের অন্যান্য খাতের বরাদ্দও অস্বাভাবিক বেশি। ওয়েবসাইট তৈরির জন্য ৫ জন ব্যাকএন্ড এবং ২ জন ফ্রন্টএন্ড ডেভেলপারের ২৩ মাসের বেতন ধরা হয়েছে ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রত্যেকর বেতন গড়ে দেড় লাখ টাকা।
এ ছাড়া অ্যাপস তৈরির জন্য ৩ জন কনসালটেন্ট পাবেন ৯৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আপ্যায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ৪৩ হাজার, প্রশিক্ষণে ১ কোটি ৩৫ লাখ এবং ডাটা সংরক্ষণে ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। প্রবাসী ভোটার রেজিষ্ট্রেশনের জন্য তৈরি অ্যাপ ১৮ নভেম্বর উদ্বোধন করেছে ইসি।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাষ্ট্রের অর্থ অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে ব্যয় করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। প্রকল্প গ্রহণের আগে এর যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কারণে নির্বাচনী ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, যা কমানো প্রয়োজন। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইভিএমসহ অকার্যকর বা অনুপযোগী প্রকল্প নেওয়ার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত আর না নেওয়া হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।


