বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু দৃশ্য চেনা ছকে ফিরে আসে। হলুদ-সবুজ জার্সিতে ব্রাজিল সমর্থকদের চোখ-মুখে আশা ও বুকভাঙা বেদনার ছবি, আর ঠিক তার পাশেই ট্রল বা রসিকতা হিসেবে হাজির করা হয় কোমল পানীয় ‘সেভেনআপ’-এর একটি বোতল।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ব্রাজিলের সেই ঐতিহাসিক ৭–১ গোলের পরাজয়ের পর থেকে এই কোমল পানীয়টির নাম ফুটবলীয় রসিকতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফলস্বরূপ, প্রতি বিশ্বকাপেই ব্রাজিল সমর্থকদের খোঁচাতে সেভেনআপ নিয়ে তৈরি হয় নতুন নতুন মিম, ট্রল আর কার্টুন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই জোয়ার দেখে যে কেউ ধরে নিতে পারেন, বিশ্বকাপ এলে বোধহয় সেভেনআপের বিক্রি আকাশচুম্বী হয়। তবে ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ী, ডিলার ও পরিবেশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই তুমুল প্রচারের ইতিবাচক কোনো প্রভাব আসলে বিক্রির খাতায় পড়ছে না।
ব্যবসায়ীদের মতে, ডিলারদের কম কমিশন, শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী, ভোক্তাদের আচরণ বদল এবং কোম্পানির ধীরগতির সিদ্ধান্তের কারণে গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীর কোমল পানীয়র বাজারে সেভেনআপ ক্রমাগত তার অবস্থান হারাচ্ছে।
ফেসবুকে ঝড় উঠলেও আয়ে ধীরগতি
ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি রেজা সেলিম রাজা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশ্বকাপের সময় সেভেনআপ নিয়ে আলোচনা বাড়ে, মিম তৈরি হয়, পোস্ট শেয়ার হয়। কিন্তু এই আলোচনার কোনো বড় প্রভাব বিক্রির ওপর পড়ে না।’
তার ভাষায়, ‘মানুষ ছবি তোলে, ফেসবুকে পোস্ট দেয়, কিন্তু বিক্রির আসল চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন।’
নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রির হিসাব তুলে ধরে তিনি জানান, আগে যেখানে দৈনিক ১২ থেকে ১৫ কেস (প্রতি কেসে ২৪ বোতল) সেভেনআপ বিক্রি হতো, এখন তা ১০ কেস করতেও হিমশিম খেতে হয়। অথচ এর বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় ২০ কেস কোকা-কোলা বিক্রি হচ্ছে।
অর্থাৎ, ফেসবুকে সেভেনআপের উপস্থিতি যতটাই উজ্জ্বল, বাজারের চিত্র ততটাই মলিন। ফেসবুকের নিউজফিড আর পাইকারি বাজারের বিক্রির খাতা যেন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলছে।
‘সেভেনআপ যুগ’ কি শেষের পথে?
ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় লেমন-লাইম বা লেবু স্বাদের কোমল পানীয়র বাজারে সেভেনআপ ছিল একক জনপ্রিয় নাম। দোকানদারেরা আগেভাগেই এর স্টক রাখতেন এবং ক্রেতারাও নাম ধরে এটি চাইতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই একচ্ছত্র আধিপত্যে ফাটল ধরেছে।
রায়সাহেব বাজারের ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে সেভেনআপের চাহিদা অনেক বেশি ছিল। এখন বাজারে বিকল্প পণ্য বেড়েছে। অনেক ক্রেতা এখন দেশি ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকছেন।’
আরেক পাইকারি বিক্রেতা আবদুল হালিম বলেন, ‘১০-১২ বছর আগেও দোকানদারেরা সেভেনআপের জন্য অগ্রিম বুকিং দিতেন। সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। স্প্রাইট, মোজো এবং ক্লেমনের মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ড বাজারে আসায় সেভেনআপের বাজার এখন ভাগ হয়ে গেছে।’
কারওয়ান বাজার এলাকার পাইকারি বিক্রেতা মো. শাহিন মিয়ার পর্যবেক্ষণও একই রকম। তিনি বলেন, ‘সেভেনআপ এখনো একটি পরিচিত ব্র্যান্ড, তবে আগের মতো একক আধিপত্য আর নেই। নতুন প্রজন্ম অনেক সময় ব্র্যান্ডের চেয়ে দাম ও আকর্ষণীয় অফার দেখে জিনিস কেনে।’
সহজ কথায়, বাজারে শুধু প্রতিযোগিতাই বাড়েনি, ক্রেতাদের পছন্দ-অপছন্দও বদলে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত নামের চেয়ে সাশ্রয়ী দাম ও তাৎক্ষণিক সুবিধাই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
কমিশন সংকটই কি মূল কারণ?
মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের মতে, অন্য কিছু ব্র্যান্ড যেভাবে বাজারে একের পর এক চমক দেখিয়েছে, সেভেনআপ গত কয়েক বছরে তেমন কিছু করতে পারেনি। তবে তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গাটি অন্যখানে।
ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে, ডিলারদের কমিশনের কাঠামোই সেভেনআপের বর্তমান সংকটের মূল কারণ।
মেসার্স আহমদী করপোরেশনের পরিবেশক রেজা সেলিম জানান, ১৯৯২ সালের পর থেকে দীর্ঘ প্রায় তিন দশকেও সেভেনআপ তাদের কমিশন ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি।
তার প্রশ্ন, ‘এই তিন দশকে যখন পরিবহন খরচ বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, গুদাম পরিচালনার খরচ বেড়েছে, তখন কমিশন কেন প্রায় একই জায়গায় আটকে থাকবে?’
ব্যবসায়ীদের দাবি, সেভেনআপের বড় বোতলগুলোয় লাভের হার বা প্রফিট মার্জিন এখনো মাত্র ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছে।
অন্যদিকে, কোকা-কোলা সাধারণত প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত মার্জিন দিয়ে থাকে। এমনকি বড় অর্ডারের ক্ষেত্রে ‘স্ল্যাব কমিশন’ নামের বাড়তি সুবিধাও পাওয়া যায়।
স্বভাবতই, একই পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করে যখন একজন ব্যবসায়ী অন্য ব্র্যান্ড থেকে বেশি লাভ পান, তখন তিনি বেশি লাভ নিশ্চিত করা পণ্যটি বিক্রিতেই বেশি জোর দেন।
‘দুটি বোতল ফ্রি’ কেন কাজে আসছে না?
সেভেনআপ বিভিন্ন সময়ে এক কার্টনের সঙ্গে দুটি বোতল ফ্রি দেওয়ার মতো প্রমোশনাল ক্যাম্পেইন বা প্রচারণামূলক অফার চালিয়েছে। কাগজে-কলমে এতে ব্যবসায়ীরা কিছুটা সুবিধা পান।
তবে পরিবেশকদের একটি বড় অংশ বলছেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
ডিলারদের মতে, ফ্রি পণ্য সাময়িক সুবিধা দিলেও একজন ব্যবসায়ী দিনশেষে নগদ লভ্যাংশ বা ক্যাশ মার্জিন খোঁজেন। কারণ ব্যবসা চলে নগদ টাকার প্রবাহের (ক্যাশ ফ্লো) ওপর ভিত্তি করে। অতিরিক্ত পণ্য মানেই বাড়তি লাভ নয়। গুদামে পড়ে থাকা অতিরিক্ত বোতল অনেক সময় ব্যবসায়ীর উল্টো খরচ বাড়ায়, কিন্তু নগদ আয়ের নিশ্চয়তা দেয় না।
‘সমস্যা শোনে, কিন্তু সমাধান দেয় না’
কমিশনের পাশাপাশি কোম্পানির ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধেও ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ক্ষোভ রয়েছে।
তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে ডিলারদের সঙ্গে কোম্পানির যোগাযোগ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোনো বিষয়ে অভিযোগ জানালেও দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যায় না।
এক পরিবেশক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসে না।’
তার মতে, ২০২৩ সালের পর থেকে সেভেনআপের বাজারের যে ধস শুরু হয়েছে, তার বড় কারণ কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা।
অর্থাৎ, বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা তো আছেই, তবে ব্যবসায়ীদের চোখে কোম্পানির ধীরগতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
ডিলার সংখ্যা কেন কমছে?
ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় একসময় যেখানে প্রায় ২২টি ডিলার পয়েন্ট সক্রিয় ছিল, সেখানে এখন প্রায় ১০টি পয়েন্টই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
কম কমিশন, বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং কোম্পানির ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা।
কয়েকজন পরিবেশক দাবি করেন, আগে যেখানে সেভেনআপের একটি ডিলারশিপ নিতে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হতো, এখন ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগের শর্তেও মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাই ফুটবল বিশ্বকাপ এলে ফেসবুকের টাইমলাইনে হয়তো সেভেনআপ আবার ট্রেন্ডিং হবে। নতুন ট্রল, রসাত্মক কৌতুক আর ভাইরাল পোস্টে সয়লাব হবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
তবে বাজারের গুদাম, ডিলার পয়েন্ট আর বিক্রির খাতায় সেভেনআপের যে চিত্রটি ফুটে উঠছে, তা অনেক বেশি কঠিন এবং রূঢ় বাস্তব।


