“ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে…” আব্বাস উদ্দিনের গাওয়া সেই কালজয়ী ভাওয়াইয়া গান শুনলে আজও চরাঞ্চলের মানুষের মনে আবেগের ঢেউ খেলে যায়। কিন্তু গান থাকলেও বাস্তবে আজ চিলমারীর বন্দরে বা রৌমারীর মেঠোপথে আগের মতো আর গরু-মহিষের গাড়ির দেখা মেলে না। কালের বিবর্তনে গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই বাহনটি কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা থেকে এখন বিলুপ্তির পথে।
ঐতিহ্যের এক সোনালী অধ্যায়
এক সময় রৌমারীর ছোট-বড় অসংখ্য চরের ধূলিমাখা পথ আর মেঠোপথে সারি সারি গরু ও মহিষের গাড়ির বহর ছিল এক পরিচিত দৃশ্য। চরাঞ্চলের উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলা, বাণিজ্যের মালামাল আনা-নেওয়া কিংবা বিয়ের বরযাত্রী—সবকিছুতেই প্রধান ভরসা ছিল এই কাঠের চাকার গাড়ি।
বিশেষ করে নতুন কনের বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় গাড়িতে ছই (বাঁশের তৈরি ছাদ) দিয়ে চারপাশ কাপড় দিয়ে ঘিরে সাজানো হতো। সেই স্মৃতি আজ নতুন প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পের মতো শোনায়। কাঠের চাকায় পোড়া তেলের ব্যবহার আর চলার সময় সেই ‘ক্যাঁচ ক্যাঁচ’ শব্দের সাথে বলদ বা মহিষের গলায় ঝোলানো কাঁসার ঘণ্টার ‘টুং টাং’ আওয়াজ একসময় গ্রামীণ জীবনকে ছন্দময় করে রাখত।
যান্ত্রিক সভ্যতার দাপট
সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে বড় পরিবর্তন। গ্রামবাংলার মেঠোপথ আজ পাকা হয়েছে। ফলে ধীরগতির গরু-মহিষের গাড়ির জায়গা দখল করে নিয়েছে যান্ত্রিক যানবাহন। এখন মালামাল পরিবহনে ব্যবহার হচ্ছে ট্রাক্টর, ট্রলি, নছিমন, করিমন ও পিকআপ। আর যাত্রী পরিবহনের জন্য রয়েছে অটোরিকশা ও বোরাক। এই তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক গাড়িয়াল তাদের পৈত্রিক পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
অভাব আর পরিবর্তনের গল্প
উপজেলার বন্দবেড় গ্রামের ভট্টু জানান, “বাপ-দাদাদের সবারই গরুর গাড়ি ছিল। পরে মহিষের গাড়িও চালিয়েছি। কিন্তু এখন আগের মতো ভাড়া পাওয়া যায় না। তার ওপর গরু-মহিষের দাম অনেক বেশি। তাই বাধ্য হয়ে কৃষি কাজ করে সংসার চালাচ্ছি।”
জন্দিকান্দা গ্রামের হায়দার আলী স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমাদের পারিবারিক পেশার স্মৃতি হিসেবে একটি গরুর গাড়ি আজও আগলে রেখেছি। এখন শুধু নিজের খেতের ফসল আনা ছাড়া অন্য কাজে এটি আর ব্যবহার হয় না।”
একই আক্ষেপ চর শৌলমারীর রেজাউলের। তিনি জানান, চরাঞ্চলেও এখন ট্রলি দিয়ে মালামাল টানা হয়। মহিষের গাড়ির কদর না থাকায় শুধু নিজের প্রয়োজনে একটি গাড়ি কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছেন তিনি।
সুপ্রাচীন ইতিহাস যখন স্মৃতি
ইতিহাসবিদদের মতে, যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় দেড়-দুই হাজার বছর আগে সিন্ধু অববাহিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে এই গাড়ির প্রচলন ছিল। হাজার বছরের সেই ঐতিহ্য আজ আধুনিক প্রযুক্তির কাছে হার মানছে।
যান্ত্রিক যুগের গতির সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে গরু-মহিষের গাড়ির দেখা মিলবে কেবল জাদুঘরে অথবা পুরনো কোনো ছবির ফ্রেমে। তবে প্রবীণদের হৃদয়ে আজও অমলিন হয়ে থাকবে সেই গাড়িয়াল ভাইয়ের মেঠোপথের গান আর ঘণ্টার টুং টাং শব্দ।


