জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শিশুরা: মা-বাবার চোখে শুধুই জল

জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শিশুরা: মা-বাবার চোখে শুধুই জল
Advertisement
Advertisement

আলমারির একটা তাক এখন পুরো খালি পড়ে আছে। একসময় সেখানে রাখা থাকত ছোট্ট এক জোড়া জুতো, প্রিয় একটা ফুটবল জার্সি, গুটি কতক খেলনা গাড়ি আর একটা ফুটবল।

এগুলো ছিল ১৩ বছরের কিশোর রাকিব হোসেনের। ফুটবল খেলতে সে বড্ড ভালোবাসত, স্বপ্ন ছিল একদিন এমন খেলোয়াড় হবে যাকে সবাই চিনবে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাস্তায় নেমে আসা মিছিলে যোগ দিয়েছিল রাকিব। একটা গ্রেনেড বিস্ফোরণে থেমে যায় তার জীবন। বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হতো ১৫ বছর।

রাকিবের বাবা সরকারি চাকরিজীবী আবুল খায়ের ছেলের জামাকাপড় আর খেলনার সবকটিই অন্যদের দিয়ে দিয়েছেন। টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, ‘জিনিসগুলো দেখলেই ছেলের কথা মনে পড়ে বুকটা ফেটে আসত, কান্না সামলাতে পারতাম না। তাই ওর কোনো স্মৃতিই আর ঘরে রাখিনি।’

ফাঁকা তাকের এই গল্প শুধু আবুল খায়েরের একার নয়; জুলাই অভ্যুত্থানে সন্তান হারানো অজস্র পরিবারের এক নির্মম বাস্তবতা।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো ৮৪৪ জনের মধ্যে ১৩৩ জনই ছিল শিশু। এদের মধ্যে ৯১ জন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, আর ৪১ জন ছিল বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শিশুশ্রমিক।

এদের কারও কারও হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, যাওয়ার কথা ছিল স্কুলে। আবার কেউ কেউ পরিবারের পেটের ভাত জোগাতে নেমে পড়েছিল শিশু বয়সেই। কেউ চেয়েছিল ফুটবলার হতে, কেউ সেনা বা ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখত। রাজপথের রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় এক নিমিষে মিলিয়ে গেছে তাদের সব স্বপ্ন।

ফুটবল খেলতে গিয়ে আর ফেরেনি রাকিব

আবুল খায়েরের তিন সন্তানের মধ্যে রাকিব ছিল সবার ছোট। মোহাম্মদপুরের আইটিজেড স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল নামকরা ফুটবলার হওয়া।

১৯ জুলাই বিকালে ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় রাকিব। আন্দোলন কিংবা মিছিলে যোগ দিতে যাচ্ছে—এমন কোনো ধারণাই ছিল না পরিবারের। বিকাল গড়িয়ে রাত হলেও রাকিব বাড়ি না ফেরায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি।

অবশেষে পরিবার জানতে পারে, রাস্তার রোড ডিভাইডারের পাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভর্তি স্লিপে তার আঘাতের জায়গায় লেখা ছিল ‘মাথায় আঘাত’, আর পাশে বন্ধনীতে লেখা ছিল ‘গ্রেনেড বিস্ফোরণ’।

রাকিবের বাবা জানান, ন্যায়বিচার চাওয়া ছাড়া এখন তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। এই আন্দোলন কী এনে দিল–প্রশ্নের জবাবে তিনি আকুল কণ্ঠে বলেন, ‘পুরো পৃথিবীটা বিক্রি করে দিলেও তো আর আমার ছোট্ট মানিককে ফেরত পাব না।’

জাবির ইব্রাহিম: হেলমেট পরা সেই শেষ ছবি

৪ আগস্ট রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাবা আবুল কাশেমের কাছে জাবির বারবার বলছিল, পরদিন সে আন্দোলনে যাবে। বাবা তাকে বকাঝকা করে ঘুমিয়ে পড়তে বলেন। কিন্তু পরদিন সকাল ৯টা বাজতেই জাবির ঘুম থেকে উঠে পড়ে—অন্য যেকোনো দিনের অভ্যাসের চেয়ে যা ছিল একেবারেই আলাদা।

সেদিন সকালে বাবাকে জড়িয়ে না ধরে জাবির মামার হেলমেটটা মাথায় চাপাল, তারপর বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল একটা ছবি তুলে দিতে। কারণ, জানতে চাইলে সে জানায়, বড় হয়ে সে সেনা কর্মকর্তা হতে চায়।

আরও পড়ুন

বাবাকে উদ্দেশ্য করে জাবির বলেছিল, ‘দেখছ না পুলিশ কীভাবে আমার ভাইদের গুলি করছে? আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দেব, তারপর পুলিশদের গুলি করব।’

সেদিন হেলমেট মাথায় জাবিরের তিনটি ছবি তুলে দিয়েছিলেন বাবা। ছবিগুলো এখনো তার মোবাইল ফোনে সংরক্ষিত আছে।

দুপুরের দিকে জাবিরের মা বাইরে লোকজনের জটলা দেখে বাবাকে বাইরে ডাকেন। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে উত্তরা পূর্ব থানার উত্তর পাশে নির্মাণাধীন এক লোহার ব্রিজের ওপর পরিবারের ছবি তুলছিল জাবির।

জাবিরের বাবা জানান, ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি দেখেন ফ্লাইওভারের দিক থেকে মাথায় হেলমেট, গায়ে টি-শার্ট ও পরনে পুলিশের প্যান্ট পরা ১৭-১৮ জনের একদল লোক গুলি চালাতে চালাতে আর সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে চারিদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুই ছেলেকে দুই কোলে তুলে নিয়ে তিনি বাড়ির দিকে দৌড় দেন। এপিবিএন গেট এলাকায় পৌঁছানো মাত্রই আবারও গুলির শব্দ। আর ঠিক তখনই চিৎকার করে ওঠে জাবির।

প্রথমে বাবা ভেবেছিলেন জাবির হয়তো রাবার বুলেটের আঘাত পেয়েছে। কিন্তু ছেলেটি আর হাঁটতে পারছিল না। বাবার কোলে করেই তাকে তড়িঘড়ি নেওয়া হয় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হলেও চিকিৎসকরা রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে পারেননি। সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে জাবির।

সেদিন বিকেলে তোলা পারিবারিক ছবিগুলোই এখন জাবিরের শেষ স্মৃতি। মোবাইলের পর্দায় বন্দী ছোট্ট ওই হাসিটুকু সম্বল করেই বেঁচে আছেন জাবিরের বাবা।

রাকিব আঁকত ছবি, স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার

১৯ জুলাই পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের সময় মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই মারা যায় ১৫ বছরের সারওয়ার হোসেন রাকিব। গাইবান্ধা সদর উপজেলায় তাদের মূল বাড়ি হলেও পরিবার নিয়ে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের একটি ভাড়া বাসায় থাকত সে। আহমাদ উল্লাহ ও ফ্যান্সি খাতুন দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে রাকিব ছিল সবার ছোট।

উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের ছাত্র রাকিবের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। ছবি আঁকতে ভালোবাসত সে; গ্রাফিতি এঁকে আন্দোলনের সমর্থনে অংশও নিয়েছিল।

মা ফ্যান্সি খাতুন এখনও মনে করেন ছেলের সেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথা: ‘আমার ছেলেটা খুব মেধাবী ছিল… সব সময় বলত, ‘আম্মা, আমি আন্দোলনে যাচ্ছি, মিছিলে যাচ্ছি। আমার স্কুল মিছিলে গেলে আমিও যাব। তুমি আমাকে আটকে রাখতে পারবে না।’

পরিবারটি এখনো কোনো মামলা করেনি। রাকিবের মা বুকভাঙা কান্নায় বলেন, ‘ঢাকায় আমাদের দেখার মতো কেউ নেই। মামলা কে করবে? কেই-বা এর পেছনে দৌড়াবে? আমরা আমাদের মামলা আল্লাহর আদালতে পেশ করেছি। তিনিই ন্যায়বিচার করবেন।’

সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা ও শোকস্তব্ধ হয়ে অসুস্থ বাবা ও পরিবার ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন।

ইসমাইল: পরিবারের হাল ধরতে শৈশব বলিদান

১৭ বছরের ইসমাইলের কাছে শৈশব মানে কোনো খেলার মাঠ ছিল না, ছিল জুতো কারখানার যন্ত্রপাতির শব্দ। দারিদ্র্য অনেক আগেই তার শৈশবকে কেড়ে নিয়েছিল।

২০০৮ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া ইসমাইলের পৈতৃক ভিটা কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুরে, যদিও তার বেড়ে ওঠা এই রাজধানীতেই। বাবা জসিম পরিবারের দায়িত্ব এড়িয়ে চলতেন, কোনো খোঁজখবর বা আর্থিক সহায়তা দিতেন না। সংসারের পুরো বোঝা এসে পড়েছিল মা তাসলিমা আক্তারের ওপর, যিনি বাসা-বাড়িতে কাজ করতেন। ইসমাইল কারখানায় কাজ করে যা পেত, তার পুরোটাই তুলে দিত মায়ের হাতে। পরিবারে আনন্দের একমাত্র উৎস ছিল তার সাত বছরের ছোট বোন রোশনি, যাকে সে বড্ড ভালোবাসত।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সকালটা আর দশটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। সেদিন কারখানা থেকে বেতনের পুরো টাকা তুলে এনে মায়ের হাতে দেয় ইসমাইল। মায়ের হাতের রান্না খেয়ে সে বলে, দাদির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। কিন্তু আর কোনোদিন ফেরা হয়নি তার।

বিকালে বাসায় ফিরে ইসমাইলকে না পেয়ে বারবার ফোন দেন তাসলিমা, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। রাত ৯টার দিকে ইসমাইলের এক বন্ধু ফোন করে জানায়, মোহাম্মদপুরে পুলিশের গুলিতে ইসমাইল মারা গেছে। খবর পেয়ে পাগলের মতো ছুটে যান মা, কিন্তু ছেলের লাশের কোনো সন্ধান পাননি।

অবশেষে রাত ১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে নিজের কলিজার টুকরো ইসমাইলের নিথর দেহ শনাক্ত করেন তিনি। বুকফাটা কান্না আসলেও পুলিশ ভয়ভীতি দেখিয়ে তার মুখ বন্ধ রেখেছিল বলে জানান তাসলিমা। পরদিন, ২০ জুলাই আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয় ইসমাইলকে।

কঠোর দারিদ্র্যের কারণে পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়ালেখা করা হয়নি ইসমাইলের, ঢুকতে হয়েছিল কাজে। তাও স্বপ্ন ছিল সংসারের অভাব দূর করবে, মায়ের কষ্ট ঘোচাবে। কিন্তু একটি মাত্র গুলিতে সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল।

অশ্রুসজল চোখে মা তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলেটা যা আয় করত, সব আমাকে এনে দিত। ওই তো সংসারটা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। এখন আমি কার জন্য বাঁচব? ছোট মেয়েটার দিকে তাকালেই আমার বুকটা ফেটে যায়।’

চোখের জল মুছতে মুছতে ইসমাইলের দাদি ঝরনা বলেন, ‘ওর একটা ছোট বোন আছে, যে এখনো পড়াশোনা করছে। এখন ওদের কে দেখবে? আমাদের নিজেদেরই যেখানে পেট চলে না, সেখানে ওদের দায়িত্বও এখন আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ল।’

স্যাঁতসেঁতে এক কামড়ার ভাড়া ঘরে এখন চরম অনটনে দিন কাটছে ইসমাইলের মা ও বোনের। মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা করেছেন মা, কিন্তু বিচারের পথ যে বড্ড দীর্ঘ ও কষ্টকর। মামলার কাগজের দিকে যতবার চোখ পড়ে, ভেতরের যন্ত্রণাটা ততটাই দ্বিগুণ হয়ে ওঠে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad