জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ভর্তি পরীক্ষা দিতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীদের ছুটে আসতে হয় ক্যাম্পাসে। এতে বাড়তি হয় যাতায়াতের খরচ, আবাসনের সংকট ও নানা ধরনের ভোগান্তি। এসব সমস্যা কমাতে বিভাগীয় শহরগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার আলোচনা চলছে কয়েক বছর ধরে। উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে একাধিকবার। গঠন করা হয়েছে কমিটি, যাচাই করা হয়েছে সম্ভাব্যতা। তবে এতসব প্রক্রিয়ার পরও ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে বিভাগীয় শহরে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি জাবি প্রশাসন।
আবেদন ফি, দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি এবং পরীক্ষার কেন্দ্র ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু বিষয়কে এ ক্ষেত্রে জটিলতা হিসেবে দেখছে প্রশাসন। ফলে দীর্ঘদিনের আলোচনার পরও নতুন পদ্ধতিটি আসন্ন শিক্ষাবর্ষে চালু হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
বিভাগীয় শহরে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্তের অগ্রগতির জানার জন্য সাক্ষাৎ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) ও কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা। তার বক্তব্যে উঠে আসে বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা আয়োজনের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার নানা দিক।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, ভর্তি-সংক্রান্ত ভোগান্তি কমাতে বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। কয়েক বছর ধরেই এ নিয়ে আলোচনা চলছে। এবার ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে পদ্ধতিটি চালুর লক্ষ্য নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতাও শুরু হয়। বিষয়টি যাচাই করতে চারটি উপকমিটি গঠন করা হয়। পরে কমিটিগুলো তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
গত ২২ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটির সভায় উপকমিটিগুলোর প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়। তবে সভায় চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা নিতে হলে শুধু কেন্দ্র নির্ধারণ করলেই হবে না; একই সময়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সূচিও বিবেচনায় নিতে হবে। সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে তাদের ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করেছে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এবং রমজানের আগপর্যন্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা চলবে। ফলে জাবির জন্য এমন একটি সময় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যখন বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রয়োজনীয় কেন্দ্র পাওয়া যাবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবহারের বিষয়টি। বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা আয়োজন করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্র ও অন্যান্য সুবিধা ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফির ওপর।
বর্তমানে অন্যান্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় জাবির ভর্তি আবেদন ফি তুলনামূলক কম। ফলে নতুন ব্যবস্থার কারণে ফি বাড়লে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে প্রশাসন।
তবে বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা-অসুবিধা দুই দিকই রয়েছে। প্রশাসনের মতে, ঢাকায় থাকা কোনো শিক্ষার্থীকে অন্য বিভাগে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হলে তার যাতায়াতসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। বিপরীতে ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের শহরে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেলে তাদের যাতায়াতের খরচ ও ভোগান্তি কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
আলী রেজা জানান, বিভাগীয় শহরে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী কাঠামোও যুক্ত। একাডেমিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার একাডেমিক কাউন্সিলের। তাই সম্ভাব্যতা, ব্যয় এবং বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো কাউন্সিলের সামনে উপস্থাপন করা হবে। এরপর কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করা হবে।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা বিভাগীয় শহরে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের উদ্যোগ এবারও বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে এসে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছে। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমানোর যে লক্ষ্য সামনে রেখে উদ্যোগটির আলোচনা শুরু হয়েছিল, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে সেটি বাস্তবে রূপ নেবে কি না, এখন সেই উত্তর মিলবে একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে।


