যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টার পর জ্ঞান ফিরেছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টা পাইকের। তিনি এখন জেগে আছেন এবং কথা বলছেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা।
মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে আইনজীবীরা জানান, ৫০ বছর বয়সী পাইক হাসপাতালে হাতকড়া পরা অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
গত বুধবার প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুই দফা চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ইনজেকশনে দেওয়া রাসায়নিক শরীর থেকে অপসারণের জন্য চিকিৎসা চলাকালে কয়েক দিন তিনি অচেতন ছিলেন।
বিবিসির খবরে বলা হয়, পাইকের সুস্থ হয়ে ওঠার ঘটনা নজিরবিহীন। প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের পর বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি বলে ধারণা করা হচ্ছে বলছেন, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞরা।
তার আইনজীবীরা তার শারীরিক অবস্থার উন্নতিকে ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তার ভবিষ্যৎ শারীরিক অবস্থা এখনো অনিশ্চিত। আইনজীবীদের মতে, অন্তত দীর্ঘ সময় ধরে তাকে সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
ফোর্ডহ্যাম ল স্কুলের অপরাধবিজ্ঞান বিষয়ক অধ্যাপক ডেবোরা ডেন্নো বলেন, পাইক সচেতন হয়ে কথা বলছেন, এ ঘটনায় তিনি ‘বিস্মিত’।
ডেন্নোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আরও সাতজন বন্দী নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় বেঁচে গেছেন। তবে ওই ঘটনাগুলোতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারীরা বন্দীদের শিরায় কোনো ওষুধই প্রবেশ করাতে পারেননি। পাইকের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছিল।
ডেন্নো বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় যা যা করার কথা, পাইকের ক্ষেত্রে সেগুলো করা হয়েছিল; কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
পাইককে আবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ এখনো কিছু জানায়নি। ইনজেকশন প্রয়োগের পর কী কারণে প্রক্রিয়াটি ব্যর্থ হলো, তারও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি তারা।
টেনেসির গভর্নর বিল লি চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য অঙ্গরাজ্যে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছেন। অঙ্গরাজ্যের কারা বিভাগের প্রধানও সপ্তাহান্তে পদত্যাগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কোলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ওই সময় পাইকের বয়স ছিল ১৮ বছর। তার তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপের সঙ্গে মিলে তারা স্লেমারকে মারধর, নির্যাতন ও হত্যা করেন।
বুধবার ন্যাশভিলের আদালতে পাইকের আইনজীবীদের হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। পরে আদালতের বাইরে তারা সংবাদ সম্মেলনও করবেন।
পাইককে চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া অ্যানেসথেসিওলজিস্ট জোয়েল জিভট বলেন, প্রাণঘাতী ইনজেকশন থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা খুবই কম। তার মতে, সাধারণত এ ধরনের ইনজেকশন প্রয়োগের পর মানুষ মারা যায়। তাই পাইকের বেঁচে থাকা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা।
তবে পাইকের শরীরে কতটা রাসায়নিক প্রবেশ করেছে, ইনজেকশনের পর তার রক্তে রাসায়নিকটির মাত্রা কত ছিল এবং তার সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া কেমন হবে, এসব বিষয়ে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে জানান জিভট।
তিনি বলেন, এখনই বলা যাবে না যে পাইকের সব বড় ধরনের ঝুঁকি কেটে গেছে।
জিভটের মতে, গত সপ্তাহে পাইককে দেওয়া রাসায়নিকের দুটি ডোজ স্বাভাবিকভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করলে তার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। তবে সম্ভবত রাসায়নিকটি রক্তনালিতে প্রবেশ না করে ত্বকের নিচের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বিলম্বে তাকে পুনরুজ্জীবিত করার কারণে মস্তিষ্কে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলেও এর আগে জানিয়েছিলেন জিভট। তার প্রকৃত শারীরিক অবস্থা বোঝা এবং স্নায়বিক পরীক্ষা করতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে তিনি ধারণা করেছিলেন। ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ইতিমধ্যে ছয় দিন পেরিয়েছে।
পাইকের আইনজীবীরা আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, তার শারীরিক গঠন ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত ইতিহাস, বিশেষ করে রক্তে প্লেটলেটের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিজনিত থ্রম্বোসাইটোসিস এবং ছোট শিরা, মৃত্যুদণ্ডের সময় অপ্রয়োজনীয় ব্যথা ও ভোগান্তির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মঙ্গলবার তারা জানান, তার দুই হাতে গুরুতর ক্ষতি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশটিতে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ব্যর্থ বা সমস্যাপূর্ণ ছিল।
প্রাণঘাতী ইনজেকশনের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা সাধারণত শিরায় নির্ভরযোগ্যভাবে আইভি প্রবেশ করাতে না পারার কারণে ঘটে। তবে ঘটনাভেদে এর কারণ ভিন্ন হতে পারে।
সংস্থাটির নথিভুক্ত ঘটনাগুলোতে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের আগেই সব প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়েছিল। চলতি বছরের শুরুর দিকে টেনেসিতেই সর্বশেষ ব্যর্থ প্রাণঘাতী ইনজেকশনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।


