ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরজুড়ে বেআইনিভাবে বসবাস করছে প্রায় ১৫ হাজার অনুপ্রবেশকারী। তাদের মধ্যে বহু বাংলা ভাষাভাষী হওয়ায় এদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে একতরফাভাবে চিহ্নিত করছে সেখানকার প্রশাসন। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের হাতে। এরা আদৌ বাংলাদেশি কিংবা রোহিঙ্গা কি না- তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বারবার।
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর থেকে যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত নাগরিকদের অনুপ্রবেশকারী বানিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে তা নিয়ে এরইমধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা হয়েছে। পরে দেখা গেছে, তারা বাংলাদেশের নয় বরং পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক। বিজেপি সরকার জোরপূর্বক তাদের বাংলাদেশি সাজিয়ে এপারে পাঠিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করেছে।
এ নিয়ে সরব হয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। সম্প্রতি ছত্তিশ গড়ে ২৩ জনকে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে যাদের প্রত্যেকের বাড়ি মুর্শিদাবাদে সুতি থানা এলাকায়। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে এই ২৩ জনকে জেল থেকে মুক্ত করে মুর্শিদাবাদের ফেরানো সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ যাদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে তারা আদৌ বাংলাদেশি কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
এ ছাড়া উত্তর দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়াসহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় পশ্চিমবঙ্গের বৈধ নাগরিকদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে অভিযোগ এনে নানা ভাবে হয়রানি করে হোল্ডিং সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ নিয়েও ভারতের মানবাধিকার সংগঠনগুলো আন্দোলন করে আসছে। এরইমধ্যে বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষকে বাংলাদেশে পুশইনের পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ও বাংলাদেশের সহযোগিতায় অনেককেই আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
সম্প্রতি এ বিষয়ে সরব হয়েছে ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম)। সংগঠনের সম্পাদক কিরিটী রায় জানিয়েছেন, কাশ্মীর থেকে ১৫০ জন বাংলাভাষী শ্রমিকদের দক্ষিণ দিনাজপুরে আনা হয়েছে এবং বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হয়েছে। তিনি জানান, আরও ১৫০জন মিলিয়ে মোট প্রায় ৩০০ জন শ্রমিককে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তাদের কাছে খবর রয়েছে।
কিরিটী রায় অভিযোগ করেন, কাশ্মীরে কর্মরত বাংলাভাষী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এর ফলে বহু ভারতীয় নাগরিককে অন্যায্যভাবে আটক করা হচ্ছে এবং এমনকি অনেককে জোরপূর্বক সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।
বর্তমানে দক্ষিণ দিনাজপুরের ঠিক কোন জায়গায় এই শ্রমিকদের রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে সংগঠনটি এবং সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। কিরিটী বলেন, ‘বাংলাভাষী হলেই বাংলাদেশি নয়, আমরা এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির কাছে দরবার করব। কেন বাংলাভাষী মানুষদের এইভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।’
বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬০০ জন বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করেছেন জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। যে দালালচক্রের মাধ্যমে তারা অনুপ্রবেশ করেছিল, গোয়েন্দারা সেই চক্রের সন্ধানও চালাচ্ছেন।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিহ্নিত অনেকেই সেখানে শ্রমিকের কাজ করে। আবার অনেকে দোকান বা রেস্তোরাঁয় কাজ জুটিয়ে নেয়। যদিও গোয়েন্দাদের দাবি, বাংলাদেশি জঙ্গি সংগঠনের কিছু সদস্য যারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মগজধোলাই করেছে, তারাও ওই অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে শ্রমিকদের ছদ্মবেশেই জম্মু ও কাশ্মীরে পৌঁছায়।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে তাদের শনাক্তকরণের পর বিমানে করে নিয়ে আসা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরা বিমানবন্দরে। পরে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে গিয়ে ওই ‘বাংলাদেশিদের’ ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করছে কেন্দ্রীয় সরকার।
গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারা বেআইনিভাবে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে দাবি করে সূত্র জানায়, এরইমধ্যে ১৫০ জন বাংলাদেশিকে এনে সীমান্তবর্তী চ্যাংরাবান্ধা, হিলি ও মালদহ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কাজ শুরু করেছে বিএসএফ। বৃহস্পতিবারের মধ্যে আরও ১৫০ জন বাংলাদেশিকে এই রাজ্যে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের উত্তরবঙ্গ সীমান্ত ছাড়াও দক্ষিণবঙ্গের বেনাপোল ও গেদে সীমান্ত পেরিয়েও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে আলোচনা চলছে। বাকিদের পরের দফায় ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে চলছে আলোচনা।
গোয়েন্দাদের দাবি, মূলত দালালচক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারা চোরাইপথে বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ করে। তার পর ওই দালালচক্রের মাধ্যমেই তারা ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশটির বিভিন্ন জায়গায়। বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে নিয়ে যাওয়া হয় জম্মু ও কাশ্মীরে। এ বিষয়ে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছেও তথ্য রয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


