একসময়ের প্রমত্তা বলেশ্বর নদ আজ পিরোজপুরবাসীর জন্য এক মরণফাঁদ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতা ও অপরিকল্পিত শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীটি এখন মৃতপ্রায়। নদীর বুকজুড়ে জেগে ওঠা বিশাল চরের কারণে নৌ-চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে। এমনকি পানির তীব্র সংকটে পিরোজপুর পৌরসভার একমাত্র ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টটিও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বলেশ্বর নদের মাঝপথে যাত্রী ও মালবাহী নৌকা আটকে থাকা এখন নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চরে আটকে থেকে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন যাত্রীরা। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে নদীর মাঝখান দিয়ে হেঁটেই এপার-ওপার যাতায়াত করছে।
স্থানীয় খেয়াঘাটের মাঝিরা জানান, নাব্য সংকটে জোয়ারের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দখল আর অপরিকল্পিত ব্লক ফেলার কারণে নদীটি তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে।
দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এই নদীতে নৌকা চালানো মাঝি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এক সময় নদীর গভীরতা ছিল। বড় বড় জাহাজ মালামাল নিয়ে আসত। কিন্তু সাত-আট বছর আগে শহর রক্ষার নামে নদীর মাঝখানে ব্লক ফেলে বাঁধ তৈরি করায় নদীর স্বাভাবিক মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে। এখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও নদীর মাঝখান দিয়ে হেঁটে পার হতে পারে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না।
নদীর এই করুণ দশার প্রভাব পড়েছে পিরোজপুর পৌরসভার পানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান জানান, বছরের এই সময়ে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় প্লান্টটি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পৌর কর্তৃপক্ষ এখন বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের কথা চিন্তা করছে।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েক বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর তীর সংরক্ষণে অপরিকল্পিতভাবে ব্লক ফেলায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে নদীর এক-তৃতীয়াংশ এখন চরে পরিণত হয়েছে। তবে এই অপরিকল্পিত কাজের দায় এড়িয়ে পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুসাইর হোসেন জানান, ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে নদীটি খনন করে চর অপসারণের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
উল্লেখ্য, পিরোজপুর পৌরসভার লক্ষাধিক মানুষ সুপেয় পানির জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি বলেশ্বর নদের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি এই নদের পানি ব্যবহার করে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষিকাজ হয়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অঞ্চলের কৃষি ও জনস্বাস্থ্য চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


