চৈত্রের বিদায় বেলায় গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। বিদ্যুতের এই ঘাটতির মাঝেই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছেজ্বালানি তেলের সংকট।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। সেচকাজে বৈদ্যুতিক পাম্পগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো যাচ্ছে না। আবার বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহারের সুযোগও সীমিত হয়ে আসছে। জ্বালানি তেলের অভাবে অনেক ডিজেল পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছেকৃষিকাজ।
সামনে গ্রীষ্মকাল শুরু হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়লে ফ্যান ও এসিসহ শীতলীকরণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে। তখন বিদ্যুতের চাহিদাও অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে লোডশেডিং আরও বিস্তৃত হয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও জ্বালানি তেল ও গ্যাসের আকাশচুম্বী দাম বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বিশেষ করে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৯৮০ মেগাওয়াট। সেই সময়ে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। চলতি বছরে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন পিডিবির কর্মকর্তারা। এই বিশাল চাহিদা মেটানোর মতো জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, এরই মধ্যে সারা দেশে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। সিলেটের আম্বরখানা ও শাহজালাল উপশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এমনকি গত শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনেও এই ভোগান্তি কমেনি।
আম্বরখানার বাসিন্দা তুহিন আহমেদ জানান, গভীর রাত পর্যন্ত লোডশেডিং চলে। বিদ্যুতের অভাবে বিপণিবিতানগুলো সন্ধ্যা সাতটার মধ্যেই বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।
সিলেট বিপিডিবি’র প্রধান আব্দুল কাদির জানান, অনিয়মিত জ্বালানি সরবরাহের কারণে উৎপাদনে ঘাটতি রয়েছে। সিলেট অঞ্চলে বর্তমানে ১৭০ থেকে ১৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১০ শতাংশ ঘাটতি থাকছে।
মাগুরা জেলায় গত শনিবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট চরম আকার ধারণ করে। সেদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে অন্তত ছয়বার বিদ্যুৎ চলে যায়। আট ঘণ্টার মধ্যে বাসিন্দারা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিলেন।
সাজিয়ারা গ্রামের পোল্ট্রি খামারি শামিম হোসেন জানান, তীব্র গরমে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে তার মুরগি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এর ফলে ডিমের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
মাগুরা জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ মহিতুল ইসলাম জানান, শুক্রবার তাদের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৬৩ মেগাওয়াট। তবে তারা সরবরাহ পেয়েছেন মাত্র ৩৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল।
যশোরে বর্তমানে দিনে তিনবার এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং চলছে। মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরে অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং এলাকাসহ বিভিন্ন উপজেলায় মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বিপাকে পড়েছে আলু হিমাগারগুলো।
নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস জানান, জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৯০ মেগাওয়াট। চলতি সপ্তাহে তারা চাহিদার চেয়ে ১৫ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।
অন্যদিকে, ঝিনাইদহে পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। সেখানে প্রতিদিন তিন থেকে চার দফায় অন্তত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।
বিদ্যুতের এই সংকটে কৃষিখাতে চাপ বাড়ছে। কৃষকরা সেচ পাম্প চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না। সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলো চাহিদা মতো জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না।
ঝিনাইদহের কৃষকরা জানান, সেচের জন্য দিনে ১০ থেকে ১৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। অথচ স্থানীয় পাম্প থেকে মাত্র ২ থেকে ৪ লিটার ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। বোরো মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ ব্যাহত হওয়ায় ধান উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুল ইসলাম জানান, ধানে এখন ফুল আসতে শুরু করেছে। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিন ঠিক মতো সেচ দেওয়া গেলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।
রাজশাহীতে কৃষকরা ডিজেলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বাঘমারা উপজেলার সোহেল ফিলিং স্টেশনে গত শনিবার অর্ধশতাধিক কৃষক তাদের শ্যালো মেশিন নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। পরে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে তারা ডিজেল পান।
পবা উপজেলার কৃষক আব্দুর রশিদ জানান, পানির অভাবে তার বোরো জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে তিনি ক্ষেতে পানি দিতে পারেননি।
জ্বালানি সংকটে আম চাষিরাও দুশ্চিন্তায় আছেন। আম গাছে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করার জন্য আধুনিক মেশিন চালানো যাচ্ছে না।
জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও ধুঁকছে। টাঙ্গাইলের পল্লী পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডের উৎপাদন ক্ষমতা ২২ মেগাওয়াট। তবে বর্তমানে সেখানে মাত্র ৬ দশমিক ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ফার্নেস অয়েল চালিত এই কেন্দ্রের দুটি ইঞ্জিন বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা জানান, পূর্ণ উৎপাদনের জন্য দিনে এক লাখ ৩০ হাজার লিটার জ্বালানি প্রয়োজন। তবে সরকারের বিধিনিষেধের কারণে তারা দিনে ৩০ হাজার লিটারের বেশি ব্যবহার করতে পারছেন না।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও নাজুক। গ্রীষ্মের চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দৈনিক অন্তত এক হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। তবে এই পরিমাণ গ্যাস কখনোই সরবরাহ করা হয়নি। গত মার্চে চাহিদা ছিল ১০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে পেট্রোবাংলা সরবরাহ করেছে মাত্র ৮০ থেকে ৮২ কোটি ঘনফুট। কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আসতেও দেরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে গ্যাস কেনার আর্থিক চাপ বাড়ছে। পিডিবি’র সদস্য জহুরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে গ্যাস থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি কয়লাচালিত কেন্দ্র এখন বন্ধ রয়েছে। আদানি গ্রুপ থেকেও বিদ্যুৎ আসছে না। এমনকি মাতারবাড়ী কেন্দ্রেও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
জহুরুল ইসলাম আশা প্রকাশ করেন, চলতি মাসের ১৫ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে কয়লা সংকট কেটে যাবে। পিডিবি এখন তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। তবে এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।


