১৯৮১ সালের ১৭ মে। সেদিন মুষলধারে বৃষ্টিতে ভিজেছিল ঢাকা বিমানবন্দর। হাজার হাজার মানুষ তাকে এক ঝলক দেখার জন্য বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে জড়ো হয়েছিলেন। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে শেখ হাসিনা যখন ট্রাকে করে জনতার মাঝে এলেন, তখন তার মুখমণ্ডল ছিল গভীর বেদনায় আচ্ছাদিত। কিন্তু জনতার চোখেমুখে ছিল আনন্দ আর স্বপ্নের ঝিলিক।
শেখ হাসিনার সেই বিষাদমাখা চেহারায় ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাবা-মা, তিন ভাই, দুই ভাবি আর স্বজনদের হারানোর বেদনা। যে বেদনা তিনি বয়ে চলেছেন প্রায় ছয় বছর।
আর জনতার মাঝে ছিল জাতির পিতার কন্যাকে নিজেদের মাঝে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। চোখে ছিল রাজনীতির বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপবিহীন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন।
জনতার সেই স্বপ্নকে আরও এগিয়ে নেন শেখ হাসিনা। দেশে পা রেখে তিনি বাবা-মা-ভাই-ভাবিসহ স্বজনদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলেননি। বলেছিলেন, ‘আমি হারানো সবকিছু ফিরে পেতে চাই না, আমি চাই আপনারা আমার সঙ্গে আসুন। জাতির পিতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
এখন সাধারণ মানুষেরই প্রশ্ন, একসময় যিনি ছিলেন গণতন্ত্রের আইকন, গণতন্ত্রের মানসকন্যা নামে যিনি ছিলেন পরিচিত; ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে সেই তিনিই কীভাবে স্বৈরাচার ও একনায়ক হয়ে গেলেন?
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকেই দেশে চলছিল প্রত্যক্ষ ও ছদ্ম সামরিক শাসন। দেশে ফিরেই সেই শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। লক্ষ্য একটাই-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য সবসময় তিনি নির্বাচনকে সবচেয়ে বেশি শুরুত্ব দিয়েছেন। সামরিক শাসক এরশাদের কাছ থেকে নির্বাচন আদায় করেছেন। সেই নির্বাচনের ফল প্রকাশে নজিরবিহীন কারচুপির প্রতিবাদে আবারও রাস্তায় নেমেছেন।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই আন্দোলনে নিজেদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে পরিচিত বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করতেও দ্বিধা করেননি। এই দুই দলের আন্দোলনে অবশেষে বিদায় নেন এরশাদ।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। ক্ষমতায় যায় বিএনপি। কিন্তু বিএনপির গণতান্ত্রিক শাসনামলেই নষ্ট হতে থাকে মানুষের ভোটের অধিকার। ফলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আবারও আন্দোলন গড়ে তোলেন শেখ হাসিনা। তত্ত্বাধায়ক সরকার আদায় করে পরবর্তী নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ, প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা।
অনেকে মনে করেছিলেন ক্ষমতায় এসেই শেখ হাসিনা স্বজন হত্যার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠবেন। বিশেষ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল করে খুনিদের দ্রুত বিচার করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবেন। কিন্তু তিনি সেই পথে যাননি। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা রেখেছিলেন। নিম্ন আদালতে সেই বিচারের রায় হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে সেই রায় হাই কোর্টে গেছে। ক্ষমতায় থেকে সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায় তিনি দেখে যেতে পারেননি।
ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে শেখ হাসিনার এক যুগান্তকারী সফলতা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি। যেখানে প্রায় দুই যুগ ধরে যুদ্ধ চলছিল, ছিল অলিখিত সামরিক শাসন, সেখানে এই শান্তিচুক্তি ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এভাবেই বিরোধী দলে থাকার সময় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই আর ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নিজেকে এগিয়ে রেখেছেন শেখ হাসিনা।
সেই শেখ হাসিনা-ই ২০০৪ সালে তার উপর গ্রেনেড হামলার পর মানসিকভাবে পুরোপুরি পাল্টে যান। এই হামলায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার পর তিনি দেখেছেন হত্যাচেষ্টা বিচারের নামে প্রহসন। এটি তার মনে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে বয়ে বেড়ানো গভীর ক্ষতকে গভীরতর করে তোলে। চারপাশের মানুষের উপর বিশ্বাস আর প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি তার আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। একদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেন। অন্যদিকে আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেন। এককভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে নিজের দলের অনেক সিনিয়র রাজনীতিবিদকেও দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। নিজের কাছে টেনে নিয়েছেন একদল অরাজনৈতিক চাটুকারকে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর উপর শুরু করেন নির্মম দমন-পীড়ন। রাজনীতিতে অলিখিতভাবে চালু করেন নতুন স্লোগান। আর সেটি হলো, উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের দরকার নেই। কারণ গণতন্ত্র উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।
শেখ হাসিনার চরম ভুল নীতির একটা ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতকে টেনে আনা। বড় প্রতিবেশী হিসাবে ভারত অতীতেও পর্দার আড়ালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ভারতকে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দেন শেখ হাসিনা। তাদের প্ররোচনায় ২০১৪ সালে আয়োজন হয় বিরোধী দল ও ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন করে যে কলঙ্ক মাথায় নিয়েছিল বিএনপি, সেই কলঙ্কই মাথায় তুলে নেন শেখ হাসিনা।
এমন কলঙ্কিত নির্বাচন করে দেড় মাসেরও কম সময় টিকেছিল বিএনপি। কিন্তু দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে নির্মমভাবে দমন করে পুরো এক মেয়াদ টিকে যান শেখ হাসিনা। এতে দেশের কোনো শক্তিই তাকে সরানোর ক্ষমতা রাখে না-এমন বিশ্বাস পেয়ে বসে। এতে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি।
শেখ হাসিনার এই মেয়াদে সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে দুর্নীতি। ব্যাংক দখল, সরকারি অর্থ লুটপাটে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তার চারপাশের লোকজন। শেখ হাসিনা এসব দেখেও ছিলেন নির্বিকার। যেন অর্থ লুটপাটই স্বাভাবিক কাজ।
পাশাপাশি বিরোধী দল বা ভিন্নমতকে দমন করতে আরও হিংস্র হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা। এই কাজে ব্যবহার করেন রাষ্ট্রীয় বাহিনী। বাংলাদেশ হয়ে ওঠে এক পুলিশী রাষ্ট্র। ভিন্নমতাবলম্বীদের রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে গিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর গুম করে রেখেছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী। মানবাধিকার শব্দটিকেই নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। বাবা-হারানো ছোট্ট শিশুর কান্না, স্বামী হারানো স্ত্রীর আর্তনাদ, ছেলে হারানো মায়ের বিলাপ তার মনে সামান্যতম রেখাপাত করেনি। মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগকে ফু দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন।
২০১৮ সালে আবারও রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে বিএনপিকে নির্বাচনে রাজি করায় ভারত। কিন্তু সেই নির্বাচনকেও কলঙ্কিত করেন শেখ হাসিনা। ভোটের আগের রাতেই ব্যালটবাক্স ভরে রেখেছিলেন ক্ষমতাসীনরা। এভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে কোনো লজ্জা পাননি শেখ হাসিনা।
এরপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে অনেকটা নিজের পেটোয়া বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলেন শেখ হাসিনা। দেশের ভেতরে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, বাইরে ভারত। এই দুই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে জনগণ কিংবা অন্য কোনো শক্তিকেই আর পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। ভয়ানক এই শাসনকালে স্বেচ্ছাচারের চূড়ান্ত রূপ দেখিয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি’র অংশগ্রহণের দরকার মনে করলেও ২০২৪ সালে সেটিও মনে করেননি। নিজেদের লোকজন দিয়েই একটি নির্বাচন করেছেন। জন্ম হয়েছে আরো এক কলঙ্কময় অধ্যায়, আমি আর ডামি নির্বাচন।
শেখ হাসিনা মানুষ থেকে চূড়ান্তভাবে দানব হয়ে ওঠেন ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে। নিরীহভাবে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন দমনে শক্তি প্রয়োগ করেন তিনি। আন্দোলনে যখন স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়, আরও কঠোর হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা। এক পর্যায়ে এই শিশু-কিশোর-তরুণ যুবকদের দমনে বুলেট ও বোমা ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তবে ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয়, সেই প্রবাদ সত্য প্রমাণ করে শেষ পর্যন্ত তাকে পালিয়ে যেতে হয়।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, বাণিজ্য আর কূটনৈতিক সম্পর্ক ছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে অতিমাত্রায় ভারতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা। শেষ দিকে এটা আর গোপন ছিল না। দেশের মানুষ কী চায়, রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বাভাবিক রাজনীতি করতে না দেওয়ার পরিণতি কী, নতুন প্রজন্মের তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা কোনো কিছুই বুঝতে চাননি শেখ হাসিনা। মনে করেছেন, কোনো সমস্যা হলেই ভারত তা সমাধান করে দেবে। নিজেকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে না।
এভাবেই ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে এক সময়ের গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা নেত্রী হয়ে উঠেন স্বৈরাচারী একনায়ক।


