পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) গণশুনানিতে সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য উঠে এসেছে।
বুধবার রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
গণশুনানিতে বিপিডিবি জানায়, বর্তমানে তারা পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৭ টাকা ৪ পয়সা দরে বিক্রি করছে। সেই দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ-পিজিসিবি বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জ বর্তমান ৩০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৯ পয়সা করার আবেদন জানিয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ সমন্বয়ের প্রস্তাব এসেছে।
তবে দাম বাড়নোর বিরোধীতাকারী বলেছেন, দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। যা জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
বিদ্যুৎ খাতের দুই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রস্তাবের পেছনে তারা বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি আমদানির খরচ এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপকে দেখিয়েছে। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১৩ টাকা ১৯ পয়সা, যেখানে বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকা ৪ পয়সায়। এতে চলতি অর্থবছরে খাতটির ঘাটতি ৬২ থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছে।
পিজিসিবি বলছে, জাতীয় গ্রিডের সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ মোকাবিলায় সঞ্চালন চার্জ বাড়ানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
শুনানিতে অংশ নেওয়া ভোক্তা প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা ও রাজনৈতিক দলের নেতারা এসব যুক্তির বিরোধিতা করেছেন। তাদের বক্তব্য, বিদ্যুৎ খাতের ভুল নীতি, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বছরের পর বছর ধরে জমেছে। এখন সেই ব্যর্থতার খরচ সাধারণ মানুষকে দিতে বলা হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, ‘বারবার বলা হচ্ছে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, তাই দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকার তো জনগণের টাকাতেই ভর্তুকি দেয়।’
‘সবাই সরকারের হিসাব নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু মানুষ কীভাবে বাঁচবে সেটা নিয়ে কেউ ভাবছে না’, বলেন তিনি।
তার অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও অপচয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো গ্রাহকদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করা হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর দেশে নানা পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বিইআরসির অবস্থানে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘প্রতিবারই গণশুনানি হয়, এরপর দাম বাড়ানো হয়। তাই বর্তমান প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।’
তার মতে, বিইআরসির আইন এমনভাবে তৈরি যে সেখানে মূলত দাম বাড়ানোর প্রস্তাবই গুরুত্ব পায়, কমানোর বিষয়টি নয়।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রতিনিধি জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, ‘দেশের রপ্তানি খাত এমনিতেই কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।’
মোবাইল ফোন গ্রাহক সংগঠনের প্রতিনিধি মহিউদ্দিন বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষ বিদ্যুতের দাম কমার আশা করেছিল। কিন্তু এখন উল্টো দাম বাড়ানোর আলোচনা চলছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে পুরো ঘাটতি পূরণ হবে না। তবে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়েছে, এই বিষয়টিও বলেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, তার বড় অংশেই আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। আবার ভারত থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ খাতে এসে পড়ছে।
বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি জানায়, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে সরকারকে প্রায় ৫ টাকা ৪৭ পয়সা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম একেবারে ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হলে ভর্তুকি দেয়ার আর প্রয়োজন হবে না।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ খাতের নীতিমালায় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। একইসঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তার মতে, সৌরবিদ্যুতের মতো খাতে অগ্রগতি হলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
বৃহস্পতিবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির আবেদন নিয়ে আরেকটি গণশুনানি হবে। দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানি শ্রেণিভেদে গ্রাহকের জন্য ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আবেদন জমা দিয়েছে।

