গাজীপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় জনজীবনে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন স্থানীয়রা। একদিকে এসব যানবাহনের চার্জিংয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত হর্ন বাজানো, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা এবং বেপরোয়া চলাচলের কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের বিভিন্ন সড়কে অটোরিকশাচালকরা অপ্রয়োজনে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজিয়ে শব্দদূষণ সৃষ্টি করছেন। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার সামনেও বিকট শব্দের হর্ন ব্যবহারে শিক্ষার্থী, রোগী ও বয়স্ক ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন।
এ ছাড়া যাত্রী নেওয়ার জন্য অনেক চালক হঠাৎ করে রাস্তার মাঝখানে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অটোরিকশা থামিয়ে দেন। এতে যানবাহনের গতি ব্যাহত হয় এবং সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির সময়ে এ সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক চালক ট্রাফিক আইন না মেনে অতিরিক্ত গতি, উল্টো পথে চলাচল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডেও জড়িত। ফলে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে আহত হচ্ছেন পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী এবং অন্য যানবাহনের যাত্রীরা।
এদিকে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রতিদিন চার্জ দেওয়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড, হর্ন ব্যবহারে কঠোর নজরদারি এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন জরুরি। অন্যথায় যানজট, শব্দদূষণ, বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং সড়ক দুর্ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

গাজীপুর পিটিআই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী নওশিন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলে, ‘প্রতিনিয়ত অটোরিকশার উচ্চ শব্দের হর্নে বিরক্তি অনুভব করি। পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হয়। এ ছাড়া যেখানে-সেখানে অটোরিকশা পার্কিংয়ের কারণে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়, এতে আমাদের স্কুলে যাতায়াতেও সমস্যা হয়।’
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলার জাংগালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চার্জ দেওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। ফলে অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছে না এবং নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। সরকার যদি ধীরে ধীরে প্যাডেলচালিত রিকশার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেয়, তাহলে বিদ্যুতের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।’
কলেজ শিক্ষক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে অনেক মানুষ কৃষিকাজ, গাভী পালন, মাছ চাষসহ উৎপাদনমুখী পেশা ছেড়ে শহরমুখী হয়ে অটোরিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে তরুণদের মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক।’
এ বিষয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘অটোরিকশা কেন্দ্রিক যানজট বর্তমানে একটি বড় সমস্যা। এ ছাড়া যেখানে-সেখানে পার্কিং এবং উচ্চ শব্দে হর্ন বাজানোর কারণে শব্দদূষণ বাড়ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার বলেন, ‘মহানগরীতে বিপুল সংখ্যক লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশা চলাচল করছে, যা যানজট ও জনভোগান্তির অন্যতম কারণ। অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশার কারণে নগরবাসীকে নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গাজীপুরবাসীকে এ দুর্ভোগ থেকে কীভাবে স্বস্তি দেওয়া যায়, সে বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা নেওয়া হবে। নির্দেশনা পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব সিটি কর্পোরেশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে অটোরিকশা চলাচলকে নিয়মতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


