বিচারকের স্ত্রীর সঙ্গে অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে ছেলে খুন: পুলিশ

বিচারকের স্ত্রীর সঙ্গে অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে ছেলে খুন: পুলিশ
Advertisement
Advertisement

রাজশাহীতে বিচারকের ভাড়া বাসায় ঢুকে তার ছেলেকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) বলছে, বিচারকের স্ত্রীর সঙ্গে হামলাকারী লিমন মিয়ার অর্থনৈতিক বিরোধ থেকে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকা অভিযুক্ত লিমন দাবি করেছেন, বিচারকের স্ত্রী লুসির সঙ্গে তার পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দুই পক্ষের বিপরীতমুখী বক্তব্যে ঘটনার রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর মনিগ্রামে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুর রহমানের ভাড়া বাসায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত তাওসিফ রহমান সুমন (১৬) বিচারকের ছেলে। ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

একই ঘটনায় বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসি গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। আহত অবস্থায় অভিযুক্ত লিমন মিয়াকেও পুলিশ পাহারায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শুক্রবার সকালে রামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে সুমনের ময়নাতদন্ত হয়। বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক কফিল উদ্দিন জানান, ধারালো ও চোখা অস্ত্রের আঘাতে সুমনের ডান ঊরু, ডান পা ও বাম বাহুর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি রক্তনালি কেটে যায়, যার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণও ছিল।

গলায় পাওয়া কালশিরা দাগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি নরম কাপড় দিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টার ফল হতে পারে, তবে মৃত্যু সে কারণে নয়; দুই ধরনের আঘাত একই সময়ের মধ্যে হয়েছে।

ঘটনার যে বর্ণনা পুলিশ দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে–বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বাসিন্দা লিমন মিয়া বিচারকের স্ত্রীর ছোট ভাই পরিচয়ে ভাড়া বাসায় প্রবেশ করেন। আগে থেকে পরিচিত হওয়ায় বিচারকের স্ত্রী তাকে দরজা খুলে দেন।

কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে লিমন ধারালো অস্ত্র বের করলে তিনি ভয়ে একটি রুমে গিয়ে দরজা আটকে দেন। লিমন লাথি মেরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর ছেলেকে নিয়ে মা লুসি প্রতিরোধ করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে লিমন মা ও ছেলেকে ছুরিকাঘাত করেন।

আরও পড়ুন

স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে এসে গুরুতর আহত তিনজনকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক সুমনকে মৃত ঘোষণা করেন।

আরএমপির তথ্য অনুযায়ী, বিচারকের স্ত্রীর সঙ্গে লিমনের আগের পরিচয় ছিল। তিনি লিমনকে আর্থিক সাহায্য করতেন। পরে টাকা দেওয়া বন্ধ করলে লিমন বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করেন। জিডি সূত্রেও এর প্রমাণ মিলেছে।

গত ৬ নভেম্বর সিলেটের জালালাবাদ থানায় বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার একটি সাধারণ ডায়েরি করেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, লিমন তার মেয়েকে ফোন করে পুরো পরিবারকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। ওই জিডিতে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পরিচয়ের বিষয়টিও উল্লেখ ছিল। তখন লিমনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পরবর্তী সময়ে তিনি জামিনে বের হন।

তবে হাসপাতালে সাংবাদিকদের সামনে লিমন পাল্টা দাবি করেন, ঘটনাটি উল্টোভাবে সাজানো হয়েছে। বিচারকের স্ত্রী লুসির সঙ্গে তার পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে তাদের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা শুরু।

তিনি বলেন, লুসি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি রাজি না হওয়ায় সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হয়। কয়েকদিন আগে তাকে শুল্ক বিভাগে আটক রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

লিমন আরও জানান, ঘটনার দিন তিনি লুসির সঙ্গে দেখা করতে যান, সঙ্গে নেন গোলাপ, বাদাম ও পপকর্ন।

তিনি অভিযোগ করেন, বিচারকের স্ত্রী তাকে ভয় দেখান এবং তার বাবার মানসম্মান নষ্ট করার কথা বলেন। চাপের মুখে তিনি রেগে গিয়ে দরজার তালা ভেঙে ঢোকেন। এরপর ধস্তাধস্তির সময় লুসির ছেলে তাকে আক্রমণ করলে আত্মরক্ষায় তিনি ছেলের পায়ে কামড় দেন। তবে হত্যা তার উদ্দেশ্য ছিল না বলে দাবি করেন লিমন। তার কথায় ‘কামড়ে তো কাউকে মারা যায় না’।

নিজেকে সাবেক সেনাসদস্য পরিচয় দিয়ে লিমন আরও দাবি করেন, তিনি জুলাইয়ে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। হাসনাত আব্দুল্লাহদের সঙ্গে তার ছবি আছে।

তিনি দাবি করেন, ফুলছড়ি উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান এএইচএম সোলাইমান তার বাবা। তিনি সাত বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। তবে এসব দাবি নিয়ে পুলিশ কিছু বলনি।

আরএমপির মুখপাত্র গাজিউর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ অর্থনৈতিক বিরোধ বলেই পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত। আটক লিমনের বিরুদ্ধে রাজপাড়া থানায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

মরদেহ দাফনের জন্য সুমনের দেহ জামালপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গোসল, জানাজা ও পরিবহনের দায়িত্ব নিয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর