বাংলাদেশে দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নীরবে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। যা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তাদের অবস্থান সম্ভাব্য পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর চলতি সপ্তাহে ঢাকায় কড়া নজরদারিতে রাখা কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা দুই দেশের রাজধানীর কাছেই বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরছে।
মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আঞ্চলিক নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী মিয়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও ছিল।
এর পরদিন বুধবার ঢাকায় আরেকটি কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন ও ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বারিধারায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনে সাক্ষাৎ করেন।
এই বৈঠকগুলোর সময় ও ধারাবাহিকতা কূটনৈতিক মহলের মনোযোগ বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে।
মার্কিন ও ভারতীয় দূতদের ওই বৈঠকের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন গুলশানে তার বাসভবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং তাদের কন্যা জাইমা রহমানের সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরপর এসব বৈঠক বাড়তি কূটনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।
আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক এসব যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ফলাফলের সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটন ও দিল্লি ভাবছে বলে একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে।
কূটনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে, যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ঝুঁকছে, যেখানে জামায়াতে ইসলামী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারকে তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই দিনে বিএনপি চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক এবং তার পরপরই ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বরং বাংলাদেশ রাজনৈতিক মোড়ের দিকে এগোনোর সময়ে এসব বৈঠককে দেখা হচ্ছে ওয়াশিংটন ও দিল্লির মধ্যে মূল্যায়ন বিনিময়, অনিশ্চয়তা কমানো এবং পরস্পরবিরোধী পথে না চলার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে।
এসব বিষয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক কূটনৈতিক সূত্র বুধবার রাতে টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, বাংলাদেশে উভয় দেশেরই শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থ রয়েছে, ফলে পারস্পরিক সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকার নিয়ে নিজ নিজ মূল্যায়ন বিনিময় করা দিল্লি ও ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
তার মতে, ‘এটি একটি ভবিষ্যতমুখী উদ্যোগ, যার লক্ষ্য বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে যদি কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকে, তা দূর করা।’
সূত্রটি আরও বলে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এবং কখনো কখনো ঢাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে এক ধরনের সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতাও দেখা গেছে। বর্তমানে এই যোগাযোগ সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়ানোর একটি প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
আরেক কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ভারতের কৌশলগত ভাবনায় বাংলাদেশ একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে, বিশেষ করে দেশটির পূর্ব সীমান্তঘেঁষা নিরাপত্তা বিবেচনায়।
‘এদিকে ওয়াশিংটনের জন্য বাংলাদেশ ভিন্ন ধরনের জাতীয় স্বার্থের কারণ, তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল পর্যন্ত বিস্তৃত,’ বলেন ওই সূত্র।
‘দুই দেশই চেষ্টা করছে, যাতে আওয়ামী লীগ আমলের মতো বাংলাদেশ আবার প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক এজেন্ডার লড়াইয়ের মাঠে পরিণত না হয়।’
গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকা ওই সূত্রের মতে, বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে ভারত তার অগ্রাধিকারগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরবে এবং যেখানে সম্ভব সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করবে।


