সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে একটি মারামারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের দলে পুনর্বাসন এবং তৃণমূল বিএনপি কর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের চিত্র উঠে এসেছে টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট শান্তিগঞ্জের বসিয়াখাউরীতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হামলায় বিএনপি কর্মীরা আহত হন। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়। পরে পাল্টা মামলার ঘটনা খুঁজতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠদের প্রভাবের অভিযোগ সামনে আসে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠদের কারণে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী এখনো হয়রানি ও চাপের মুখে রয়েছেন।
তাদের দাবি, ৩ আগস্ট বসিয়াখাউরীর হামলায় আহতরা মামলা করার দুই দিন পর তাদের বিরুদ্ধেই পাল্টা মামলা করা হয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ। তাকে শান্তিগঞ্জ থানার ওসি ওয়ালীউল্লাহ সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ফারুক আহমেদ আওয়ামী লীগের সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের ঘনিষ্ঠজন ও সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মান্নানের সহযোগিতায় দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি ২০১৮ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট বসিয়াখাউরী গ্রামে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হামলায় বিএনপির ১৫ থেকে ২০ কর্মী আহত হন। তাদের মধ্যে ১০ জনের অবস্থা গুরুতর।

ঘটনার দিন বসিয়াখাউরীর মহিদুজ্জামান বাদী হয়ে থানায় এজাহার দেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক পিপি রইস উদ্দিনের ভাতিজা আসফাক আহমদ সুজনকে। আরও ৩৩ জনকে আসামি করা হয়।
এজাহারে বলা হয়, হামলায় আহতরা বিএনপি নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য কয়সর আহমেদের কর্মী। তারা গত সংসদ নির্বাচনে কয়সর আহমেদের পক্ষে কাজ করেছিলেন। অন্যদিকে, হামলাকারীরা পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেনের পক্ষে নির্বাচন করেছিলেন। এ নিয়ে আগে থেকেই তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরে সশস্ত্র হামলা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার বাদী মহিদুজ্জামান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এজাহার দেওয়ার পর পুলিশ তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। থানার ওসি ওয়ালীউল্লাহ এজাহারে থাকা রাজনৈতিক বিষয় বাদ দিতে বলেন। পরে তার কথায় এজাহার পরিবর্তন করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর ৬ আগস্ট মামলাটি রেকর্ড করে শান্তিগঞ্জ থানা।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মামলা নিতে বিলম্বের সময় ওসি মামলার আসামি ও হামলাকারীদের পাল্টা মামলা করার পরামর্শ দেন।
আরও পড়ুন: সুনামগঞ্জে আ.লীগের হামলায় বিএনপির ১৫ কর্মী আহত
ওসি ওয়ালীউল্লাহ ৬ আগস্ট টাইমসকে বলেন, ‘এজাহারে থাকা অতিরিক্ত কথা বাদ দিতে বলেছি। তিন দিন পর মামলা নেওয়াকে কালক্ষেপণ বলতে রাজি নই। এটি প্রক্রিয়াগত সময়। আর্থিক সুবিধা নিয়ে পাল্টা মামলা দেওয়ার অভিযোগও সত্য নয়।’
স্থানীয়দের দাবি, শনিবার পর্যন্ত আসামিরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়ালেও তাদের আটক করতে পুলিশ কোনো অভিযান চালায়নি।
শনিবার সকালে শান্তিগঞ্জ থানায় এ ঘটনায় একটি পাল্টা মামলা হয়েছে। এতে ৩ আগস্টের হামলায় আহতদের আসামি করা হয়েছে। শান্তিগঞ্জ থানার ওসি মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ওসি দাবি করেন, শনিবার যারা মামলা করেছেন তারাও আহত। তাদের অনেকের দাঁত পর্যন্ত ভেঙে গেছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘আমি অফিসের কাজে ঢাকায় আছি। মারামারির ঘটনাটি শুনেছি। তদন্ত করে সঠিক ব্যবস্থা নিতে সার্কেল এএসপিকে নির্দেশ দিয়েছি।’

নেপথ্যে বিএনপি নেতা ফারুকের আওয়ামীপ্রাতি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথম মামলার এক নম্বর আসামি সুজনসহ হামলাকারীদের সাহসের উৎস হিসেবে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদের নাম আসছে।
২০১৮ সালের উপজেলা নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেন ফারুক। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালামকে হারিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের আশীর্বাদে ফারুক উপজেলা চেয়ারম্যান হন। এ কারণে বিএনপি তখন তাকে বহিষ্কারও করেছিল।
এর প্রতিদানে ২০২৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে এম এ মান্নানের ছেলে সাদাত মান্নান অভির নির্বাচনী প্রচারে কাজ করেন ফারুক। টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে থাকা ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৫ আগস্টের প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতেও তিনি অংশ নিয়েছেন।
সাদাত মান্নান অভির নির্বাচনী প্রচারে ফারুক প্রকাশ্যে এম এ মান্নানের উন্নয়নের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি গোপালগঞ্জ ঘুরে এসেছি, টুঙ্গিপাড়া ঘুরে এসেছি। কিন্তু কোনো উপজেলায় এত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে দেখিনি। আগামী দিনে উনার সুযোগ্য উত্তরসূরি এই উপজেলাকে আরও সুন্দর ও উন্নত করবেন।’
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির দুই জ্যেষ্ঠ নেতা টাইমসকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ফারুক আহমেদ আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের আগলে রেখেছেন। এর পেছনে আসন্ন উপজেলা নির্বাচন রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
তাদের দাবি, ফারুক এবারও উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে চান। এ কারণে তিনি আগে থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছেন।
দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করায় পদ হারানো ফারুক এবারের সংসদ নির্বাচনের আগে আবার বিএনপিতে ফিরে পদ পেয়েছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে বিষয়টি রহস্যজনক।
জানা গেছে, ফারুক আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। আগে বহিষ্কৃত হওয়ায় মনোনয়ন না পাওয়ার আশঙ্কায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ কারণে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বসিয়াখাউরীর সংঘর্ষের ঘটনায় আওয়ামী লীগ কর্মী সুজনসহ আসামিদের রক্ষায় তিনি সক্রিয় হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ফারুকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আকারুজ্জামান বাবুল টাইমসকে বলেন, ‘ফারুক দলের দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী মান্নানের লোক ছিলেন। এখনো তিনি আওয়ামী লীগকে নানাভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এটি বিএনপির সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।’
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জালাল উদ্দিন বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ফারুক আহমেদ ভোট করেছিলেন। এখন তিনি আবার দলে ফিরেছেন। কী আর বলব?’


