বিদেশ পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট (বিএনএম)-এর আলোচিত নেতা কামরুল আহসান। তুরস্ক, রাশিয়া ও হাঙ্গেরিতে শ্রমিক পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তিনি ভেঙে দিয়েছেন প্রায় দেড় হাজার পরিবারের স্বপ্ন। বর্তমানে এসব পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
কামরুল আহসান ‘ভার্সেটিলো’ নামের একটি কোম্পানি খুলে পাঁচটি এজেন্সির মাধ্যমে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। তবে তিনি এখন পর্যন্ত একজনকেও বিদেশে পাঠাতে পারেননি। ফলে ভুক্তভোগীদের পাশাপাশি এজেন্সি মালিকরাও চরম বিপাকে পড়েছেন।
‘টাইমস অব বাংলাদেশে’র হাতে আসা নথিপত্র অনুযায়ী, কামরুলের প্রতিষ্ঠান এক হাজার ৫৫৫ জন শ্রমিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিক্যাল করিয়েছে। সেই নথিতে ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট নম্বর, মেডিক্যাল সেন্টারের নাম ও তারিখের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। এমনকি মেডিক্যালের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে তিনি প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
কে এই কামরুল
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে সরকার ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মদতে গঠন হয় রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট’ (বিএনএম)। এ কারণে এটি ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনএম-এ যোগ দিয়ে কামরুল আহসান রাতারাতি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি বর্তমানে বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, মাঝে মাঝে তিনি ফোনে যোগাযোগ করলেও টাকা ফেরত না দিয়ে নানা অজুহাতে কালক্ষেপণ করছেন। তবে আইনি ব্যবস্থার ভয়ে এবং টাকা ফেরতের আশায় প্রতারিত অনেক এজেন্ট এখনই নাম প্রকাশ করতে চাইছেন না।
কামরুলের প্রতারণা
শ্রমিক পাঠানোর নামে প্রতারণার শিকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এজেন্সি মালিক জানান, তুরস্ক, রাশিয়া ও হাঙ্গেরিতে লোক পাঠাতে ভার্সেটিলো গ্রুপের সঙ্গে তাদের লিখিত চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী কয়েক কিস্তিতে কামরুলকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি প্রাপ্তি স্বীকারপত্রও দিয়েছে।
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ভার্সেটিলোর সিইও সাইফুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে জানানো হয়, প্রার্থীদের ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং ভিসা ফি বাবদ জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন। সেই টাকা পরিশোধ এবং মেডিক্যাল করানোর পরও কেউ বিদেশ যেতে পারেননি। ওই এজেন্সি মালিক আক্ষেপ করে বলেন, কামরুল বিদেশে থাকলেও তিনি বাংলাদেশে পাওনাদারদের চাপে নিজের সম্পদ বিক্রি করে টাকা শোধ করছেন।
বিজয়নগরের আরেকজন এজেন্সি মালিক জানান, তিনটি দেশে জনশক্তি রপ্তানির কথা বলে কামরুল তার কাছ থেকে দেড় কোটি টাকার বেশি নিয়েছেন। বর্তমানে কামরুল ফোন না ধরায় তারা এখন মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক হাজার ৫৫৫ জন বিদেশ গমনেচ্ছুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কামরুল নির্দিষ্ট কিছু সেন্টার নির্ধারণ করে দেন। সেখানে সাধারণ খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থাৎ জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। রাজধানীর স্টার মেডিক্যাল, ইদান মেডিক্যাল, স্ট্যান্ডার্ড মেডিক্যাল ও বসুন্ধরা মেডিক্যাল থেকে এসব পরীক্ষা করতে বাধ্য করা হয় শ্রমিকদের।

ভুক্তভোগী হোসাইন খান জানান, দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর বিদেশ যেতে না পেরে তারা স্টার মেডিক্যালে যোগাযোগ করলে জানতে পারেন, ভার্সেটিলো গ্রুপের সঙ্গেই তাদের চুক্তি ছিল। এ বিষয়ে স্টার মেডিক্যালের ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসার আসাদুর রহমান জানান, অতিরিক্ত টাকা বা বিদেশ পাঠাতে না পারার দায়ভার ভার্সেটিলো কর্তৃপক্ষের, তাদের নয়।
এদিকে, ভার্সেটিলো গ্রুপের সাবেক কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। কামরুলের সাবেক সেক্রেটারি আমিনুল হক জানান, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশে লোক পাঠানোর প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার সময়ই অনেক এজেন্ট টাকা ফেরত চাওয়া শুরু করেছিলেন। পাওনা টাকা নিয়ে কামরুলের সঙ্গে সাবেক অনেক কর্মকর্তারও ঝামেলা রয়েছে।
কেবল বিদেশ পাঠানো নয়, ‘কামরুল এগ্রো’ নামের প্রতিষ্ঠান বিক্রির নামেও তিনি প্রতারণা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর স্পেকট্রাম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সিইও নূর আহমেদ খোকন জানান, ২০১০ সালে কামরুলের প্রতিষ্ঠান কেনার জন্য তিনি ও তার সহযোগীরা দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু কামরুল কোম্পানি বুঝিয়ে না দিয়ে নানা অজুহাত দেখান। পরবর্তী সময়ে তিনি ৫০ লাখ টাকার চেক দিলেও মাত্র ৫ লাখ টাকা ক্যাশ হয়েছে।
একই ঘটনার শিকার উদ্যোক্তা তানভীর ফয়সাল বলেন, টাকা ফেরত চাইলে কামরুল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিতেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কামরুল আহসানের বিরুদ্ধে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়ের করা এই মামলায় তাকে স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতারণার জাল বিস্তার করতে সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ এবং বিতর্কিত ব্যবসায়ী নাফিস সরাফতের সঙ্গে তার সখ্যতাকে কাজে লাগাতেন কামরুল। এমনকি ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বন্ধু পরিচয় দিয়েও তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন।
রাজনৈতিকভাবেও কামরুলের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। বিএনএম-এর তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহ মো. আবু জাফর জানান, গত নির্বাচনের সময় কামরুলই ছিলেন দলের সর্বেসর্বা এবং এখনো দলটির নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই রয়েছে।
দলটির অন্যতম উদ্যোক্তা ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় কামরুল জোরপূর্বক দলটি কব্জায় নিয়েছিলেন। তিনি কামরুলকে একজন পেশাদার প্রতারক হিসেবে অভিহিত করেন।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে কামরুল আহসান জানান, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ বানোয়াট ও মিথ্যা। তিনি আগামী সপ্তাহের মধ্যে এসবের লিখিত জবাব ও প্রমাণ দেবেন বলে দাবি করেন।
এদিকে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, নিজেকে রক্ষা করতে কামরুল এখন বিএনপির ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি দ্রুতই বিএনপির কমিটিতে পদ পাচ্ছেন বলেও প্রচার করছেন।


