পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘জাতিগত বাঙালি’ বিশেষ করে মুসলিমদের মৌলিক আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে ভারত জোরপূর্বক বাংলাদেশে বিতাড়ন করছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরআই)।
মঙ্গলবার এক রিপোর্টে সংস্থাটি বলেছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বিতাড়ন চেষ্টা এবং তাদের প্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রতিরোধের কারণে দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় কয়েক ডজন পরিবার অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে তারা বিএসএফের ২১টি পুশেইন চেষ্টা নস্যাৎ করেছে। এর মাধ্যমে শিশুসহ ২০০ জনের বেশি মানুষকে পুশইন করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
চলতি বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, সরকারের ‘শনাক্ত, বাতিল ও বিতাড়ন’ নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ‘ফিরে যেতে’ বাধ্য করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘ভারত এসব পরিবারকে নিষ্ঠুরভাবে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে, যা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। ভারত সরকারের উচিত অবিলম্বে এই অবৈধ বিতাড়ন বন্ধ করা, আইনি সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করা এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা।’ একই সঙ্গে মুসলিমদের প্রতি এই উদ্বেগজনক বিদ্বেষের অবসান ঘটানো প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
গত মার্চে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ঠিক আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে এবং বিতর্কিত উপায়ে ভোটার তালিকা সংশোধন করে। এর ফলে ৯০ লাখের বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে, যা আটক ও বিতাড়নের আতঙ্ক তৈরি করে। এর আগে ২০১৯ সালে আসাম রাজ্যে একটি ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার (এনআরসি) কারণে ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিল। রাজ্যের হাজার হাজার বাংলাভাষী বাসিন্দাকে আটককেন্দ্রে বন্দি রাখা হয় এবং অনেককে অবৈধভাবে বিতাড়ন করা হয়।
আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজ্যের বাংলাভাষী মুসলিমদের বার বার ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে আক্রমণ করেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে যাই এবং আক্ষরিক অর্থেই সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই। এখন আসামে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে বেশ কিছু অবৈধ বাংলাদেশি নিজে থেকেই ফিরে যেতে শুরু করেছে।’
বাংলাদেশের পঞ্চগড় সদরের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হাসিবুর ইসলাম হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানান, তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে আসা একটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাদের কাছে ভারতের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র ‘আধার কার্ড’ ছিল। কিন্তু সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় পুলিশ তাদের আটক করে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে, যারা তাদের বাংলাদেশে পুশব্যাক করার চেষ্টা করেছিল।
হাসিবুর ইসলাম বলেন, ‘ওই পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য চারবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এবার ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় তাদের কেউ ভোট দিতে পারেননি।’ সীমান্তে তিন দিন আটকে থাকার পর পরিবারটিকে ভারতে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী স্বেচ্ছায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, ভারত কাউকে জোরপূর্বক বা ভয় দেখিয়ে বিতাড়ন করতে পারে না। তা ছাড়া হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া কয়েকজনের অভিযোগ অনুযায়ী মতো তাদের নথিপত্র, টাকা-পয়সা এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়াও সমীচীন নয়।
পশ্চিমবঙ্গ কর্তৃপক্ষ কয়েকশ কথিত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে সীমান্ত এলাকার হোল্ডিং সেন্টারে নির্বিচারে আটকে রেখেছে। আটককৃতদের বেশিরভাগই মুসলিম হলেও কিছু হিন্দুও রয়েছেন। ভারতের একজন মানবাধিকার কর্মী জানান, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত এলাকায় আনুমানিক ৪০০ মানুষ হোল্ডিং সেন্টারে আটক রয়েছেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পরপরই এদের অনেককে আটক করা হয়েছে।
যদিও বাংলাদেশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আইনি মাধ্যম ছাড়া সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করা কোনো মানুষকে গ্রহণ করা হবে না। যেকোনো প্রত্যাবর্তন অবশ্যই যথাযথ নাগরিকত্ব যাচাই এবং নির্ধারিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।
উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ভারতের এই আটক ও বিতাড়নের পদক্ষেপ মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলেই মন্তব্য করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির মতে, মানুষকে খাবার, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসা ছাড়া ফেলে রাখা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।
তাছাড় ভারত সরকারের উচিত বিতাড়নের মুখোমুখি হওয়া যেকোনো ব্যক্তির জন্য মৌলিক আইনি সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করা। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, এই চুক্তি নাগরিকত্ব যাচাই এবং সুশৃঙ্খলভাবে হস্তান্তরের সুযোগ দেয়।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, সশস্ত্র দুটি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে কাউকে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতের উচিত এই নির্মম বিতাড়ন বন্ধ করা এবং দুই দেশের উচিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা যেন কোনোভাবেই মানুষের মৌলিক মর্যাদার বিনিময়ে না হয় তা নিশ্চিত করা।’


