সুস্থ প্রতিযোগিতার বদলে অর্থ, ধর্ম, পেশিশক্তি ও পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতা ফের স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তারা বলছে, এসব চর্চা নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ঝুঁকিতে ফেলছে এবং প্রাক-নির্বাচন ও গণভোট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রোববার ঢাকায় টিআইবি কার্যালয়ে ‘প্রাক-নির্বাচন এবং গণভোট পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শিরোনামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এসব কথা বলে সংস্থাটি।
তাদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ভূমিকার কারণে অবাধ, সুষ্ঠু ও সমান প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ সময়, একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ২১ জন কর্মীকে রাতের আঁধারে তুলে নেওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ জানায় টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তারা বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া গণমাধ্যমকর্মীদের এভাবে তুলে নেওয়া মুক্ত সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত এবং পুরো গণমাধ্যমের জন্য একটি ভীতিকর বার্তা।’
নির্বাচন পরিবেশ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষক মো. মাহফুজুল হক বলেন, ‘কর্তৃত্ববাদী সরকার পতনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেই ধারাবাহিকতায় ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হলেও, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও গণভোট আয়োজন নিয়ে শুরু থেকেই বিভ্রান্তি ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।’
টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের ওপর অংশীজনদের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তিন দফা ভোটার তালিকা হালনাগাদের পরও কিছু আসনে অস্বাভাবিক ভোটার মাইগ্রেশন, রোহিঙ্গা ভোটার অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ এবং সীমানা পুনর্বিন্যাস নিয়ে প্রায় এক হাজার ৮৫টি আপত্তি জমা পড়ে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন, প্রতীক বরাদ্দ ও পর্যবেক্ষক নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও, সেসব কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে বরাদ্দ অর্থ আত্মসাতের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার কথাও জানায় টিআইবি। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে প্রায় ১৪ হাজার গণমাধ্যমকর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়াকে গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারে ব্যাপকমাত্রায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। টিআইবির সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রার্থী নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছেন, গড়ে তারা ব্যয় করেছেন এক কোটি ১৯ লাখ টাকার বেশি।
সেইসঙ্গে প্রতিপক্ষকে কাবু করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো, নারী প্রার্থী ও কর্মীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক ও অশালীন আক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলেও জানায় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।
নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব চিত্রও হতাশাজনক। মোট প্রার্থীর কেবল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ নারী এবং ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু। এবার জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি।
গণভোট প্রসঙ্গে টিআইবি মনে করে, নির্বাচন ও গণভোটকে সমার্থক হিসেবে দেখার ফলে আইনি ও প্রশাসনিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়হীনতা গণভোটকে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়েছে।
তবে জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাব- বিশেষ করে ক্ষমতার অপব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং দুদককে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়ার মতো বিষয়গুলো জনগণের রায়ের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন হওয়া উচিত বলে মনে করে সংস্থাটি টিআইবি।


