ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি তার প্রথম চীন সফর করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার বিবর্তিত ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ধীর গতির পুনরুদ্ধারের প্রেক্ষাপটে এই কূটনৈতিক সফরের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর।
এই সফরটি কেবল গতানুগতিক কোনো কূটনৈতিক আদান-প্রদান ছিল না, বরং এটি ছিল কর্মমুখী ও সুনির্দিষ্ট সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে সাজানো একটি সফর। এটি বাংলাদেশের জরুরি উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং চীনকে একটি নির্ভরযোগ্য ও পরীক্ষিত অংশীদার হিসেবে দেশটির দৃঢ় স্বীকৃতির প্রতিফলন ঘটায়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সরকারি সফরের আগে, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বেইজিং সফরকালে আমি তার একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। মির্জা ফখরুলের সঙ্গে গভীর আলোচনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সফরের বাস্তব ফলাফল একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশ তার জাতীয় উন্নয়নের প্রয়োজনের দিকে মনোনিবেশ করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এই যাত্রায় চীনকে একটি নিরন্তর বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।
“সবচেয়ে বিশ্বস্ত অংশীদার” — এটি আমাদের আলাপচারিতার সময় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়ে মির্জা ফখরুলের দেওয়া কোনো সাধারণ কূটনৈতিক উক্তি ছিল না, বরং ছিল একটি আন্তরিক মূল্যায়ন। যখন তাকে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং ভারতের মতো তৃতীয় পক্ষের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি জোর দিয়ে বলেন, চীন সব সময় বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু এবং প্রয়োজনের সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন, গত কয়েক দশক ধরে দুই দেশের সহযোগিতার ভিত্তি অটল ও শক্তিশালী রয়েছে।
মির্জা ফখরুল আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, বিশেষ করে যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনতাত্ত্বিক সুবিধাকে কাজে লাগানো এবং বেকার যুবকদের উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। এই প্রেক্ষাপটে, জাতীয় উন্নয়নের গতি বাড়াতে বাংলাদেশের সরকার চীন থেকে বিনিয়োগ, ব্যবসা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা জোরদার করতে চায় বলে তিনি জানান।
বিনিয়োগ, ব্যবসা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারের এই সুস্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সফরের আলোচ্যসূচি এবং ফলাফলেও প্রতিফলিত হয়েছে। গত ৭ মে প্রকাশিত যৌথ ইশতেহারে দেখা গেছে, উভয় পক্ষ উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতা এগিয়ে নিতে এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়েছে। এগুলো কেবল বিমূর্ত কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এমন লক্ষ্যমাত্রা যা সরাসরি বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি উন্নয়ন সমস্যাগুলো সমাধানের পথ দেখায়।
বিশেষ করে, বাংলাদেশ তার উন্নয়নে চীনের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে’ চীনের অংশগ্রহণ চেয়েছে। এই অববাহিকা প্রকল্পটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষণীয় যে, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে মির্জা ফখরুলের আত্মবিশ্বাস এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সফল সফর কেবল দুই দেশের বন্ধুত্বের ঐতিহ্যকেই দৃঢ় করেনি। বরং ভবিষ্যতের সহযোগিতার একটি নীল নকশা তৈরি করেছে। কয়েক দশক ধরে বাস্তবমুখী সহযোগিতাই চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এটি এমন এক বন্ধন যা উভয় দেশের মানুষকে উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে সাহায্য করছে। বাংলাদেশ যখন প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন খুঁজছে, চীন তখন দক্ষিণ এশিয়ায় তার পারস্পরিক কল্যাণকর সম্পৃক্ততাকে আরও গভীর করছে। দুই দেশের স্বার্থ এখন একই সূত্রে গাঁথা। পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি এবং বাস্তবধর্মী প্রকল্পের মাধ্যমে চীন ও বাংলাদেশ তাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা থেকে আরও বড় ধরনের সাফল্য অর্জনের জন্য প্রস্তুত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সরকারের সিনিয়র নেতা এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুলের এই স্পষ্ট বক্তব্য একটি বার্তাই দেয়। তা হলো অনিশ্চয়তার এই যুগে উন্নয়নশীল দেশগুলো ক্রমেই বুঝতে পারছে যে প্রকৃত ও নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্ব কেবল তখনই সম্ভব, যখন সেটি সাধারণ উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। পারস্পরিক আস্থা ও উভয় পক্ষের জয় বা ‘উইন-উইন’ নীতির ওপর ভিত্তি করে চীন ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সামনের দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ যখন তার উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে, বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং আরও মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে সচেষ্ট, তখন চীন তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানো ঐকমত্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য ফলাফল বয়ে আনবে, উভয় দেশের মানুষের জন্য দৃশ্যমান সুফল নিশ্চিত করবে।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে জর্জরিত এই বিশ্বে চীন-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক আদর্শ উদাহরণ। দেশগুলোর মধ্যে প্রকৃত বন্ধুত্ব নিহিত থাকে একে অপরের উন্নয়নে সহায়তা করা, একে অপরের পছন্দকে সম্মান করা এবং সাধারণ সমৃদ্ধির দিকে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই ধরনের অংশীদারিত্বই প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন এবং এটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঠিক দিকনির্দেশনা।
লেখক: ডেপুটি ডিরেক্টর, নিউজ ডেস্ক, গ্লোবাল টাইমস।


