উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র বগুড়া শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আধুনিক কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পৌরসভা থেকে সদ্য গঠিত এই সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার পাশে ও যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন শহরবাসী।
সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ১০ লাখ মানুষের এই শহরে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টন আবর্জনা তৈরি হয়। কিন্তু এসব বর্জ্য ফেলার কোনো স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন নেই। এমনকি বর্জ্য পরিবহনের ব্যবস্থাও অপ্রতুল, যার ফলে সময়মতো বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ করা যায় না।
কর্মকর্তারা আরও জানান, বর্তমানে বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের জন্য ১৬টি ভাড়া করা ট্রাক, সিটি কর্তৃপক্ষের ২টি নিজস্ব গাড়ি এবং মাত্র ১টি লোডার ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সংকট দূর করতে আধুনিক পরিবহন পুল ও স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ২ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
দেড়শ বছরের প্রাচীন এই শহরের বর্জ্য অপসারণের ইতিহাস বেশ হতাশাজনক। এক সময় শহরের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ডাস্টবিন থাকলেও পরিবেশগত সমস্যা ও দুর্গন্ধের কারণে সেগুলো তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর ভ্যানগাড়ি দিয়ে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনগুলোতে আনা হয়। সেখান থেকে ট্রাকে করে ডাম্পিং সাইটে নেওয়ার কথা থাকলেও শহরের ভেতরের জয়পুর পাড়া এবং বাইরের এরুলিয়া—এই দুটি ডাম্পিং স্টেশনই এখন পুরোপুরি বন্ধ। ফলে বাধ্য হয়ে বাঘোপাড়া মহাসড়কের পাশে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে ময়লা ফেলা হচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয় জমির মালিকদের সাথে প্রতিনিয়ত বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
সিটি কর্পোরেশনের কনজারভেশন শাখার সুপারিনটেনডেন্ট মামুনুর রশীদ সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, সীমিত সংখ্যক ট্রাক নিয়ে কর্মীরা দৈনিক প্রায় ১০০টির মতো ট্রিপ দিলেও স্থায়ী ডাম্পিং সাইটের অভাবে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। জমির মালিকরা বাধা দিলে বিকল্প জায়গা খুঁজতে খুঁজতেই পুরো প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে।
তিনি মনে করেন, বর্জ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো কোনো আসল সমাধান নয়। বায়ু ও পানি দূষণ রোধে দ্রুত একটি কার্যকর রিসাইক্লিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, বনানী রেশম উন্নয়ন বোর্ড, সেউজগাড়ী কৃষি অফিস, রেলওয়ে স্টেশন, শিববাটি আর্ট একাডেমি এবং চারমাথা নওগাঁ রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফার স্টেশনগুলোতে ময়লার পাহাড় জমে আছে। ঐতিহ্যবাহী করতোয়া নদীর তীরে এবং শহরের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ফতেহ আলী বাজার ও সপ্তপদী মার্কেটের বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে নদীর পানি যেমনৃদূষিত হচ্ছে, তেমনি তীব্র গন্ধে পথচারী ও ব্যবসায়ীদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে।
শিববাটি এলাকার ব্যবসায়ী লিমনসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্তমান পদ্ধতি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
এনজিও ‘ক্রেডস’-এর পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মোঃ আতিকুর রহমান মল্লিকের মতে, গৃহস্থালি, শিল্প ও হাসপাতালের বর্জ্যে জিংক, সালফার, ক্যাডমিয়াম, নাইট্রোজেন এবং অ্যামোনিয়ার মতো মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। এগুলো অপরিকল্পিতভাবে ফেলে রাখায় মাটি ও পানির মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনবে।
বাপার (বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন) বগুড়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ২০১৯-২০ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের প্রস্তাবিত ৩৫ কোটি টাকার বর্জ্য রিসাইক্লিং প্রকল্প আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতায় বাস্তবায়ন করা যায়নি।
সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম সক্ষমতার ঘাটতি মেনে নিয়ে জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২ হাজার কোটি টাকার নতুন একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অন্যদিকে, সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এম. আর. ইসলাম স্বাধীন আশ্বস্ত করেন, শহরের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে বর্জ্য সংরক্ষণ এবং একটি বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদী আধুনিক প্ল্যান্ট স্থাপনের লক্ষ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।


