বদ্ধ রান্নাঘর, নকশার ত্রুটি: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শহরের নারীরা

বদ্ধ রান্নাঘর, নকশার ত্রুটি: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শহরের নারীরা
রাজধানীর বাসাবো এলাকার সরু ও ধোঁয়াচ্ছন্ন রান্নাঘরে কাজ করছেন রীনা কর্মকার। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
Advertisement
Advertisement

মিরপুরের এক বাসায় থাকেন ৪৬ বছর বয়সী রাশিদা খাতুন (ছদ্মনাম)। সেই বাসার রান্নাঘরটা এতটাই ছোট যে, একসঙ্গে দু’জন ঢুকলে কনুই ঠেকে যায়। এক কোণে চুলা, পাশে বেসিন, আর নড়াচড়ার জায়গা মাত্র দুই হাত। ঘাম ও ধোঁয়ায় ভরপুর সেই গরম রান্নাঘরে প্রতিদিনের যুদ্ধ তার।

আক্ষেপের সুরে রাশিদা বলেন, ‘একটা কাজও আরামে করা যায় না, জায়গা নাই। কিছু রাখতেও পারি না ঠিক মতো।’ ছোট জায়গার এই সীমাবদ্ধতায় শুধু যে রান্নার কষ্ট বাড়ায় তা না, শরীরে ফেলছে প্রভাব। ‘বেসিনটা নিচে, তাই নিচু হয়ে কাজ করতে হয়। এখন ওঠা-বসার সময় কোমর ব্যথা করে। আর গরম, ধোঁয়া আর তেলের গন্ধে ভরে থাকে রান্নাঘর। মাঝে মাঝে মনে হয় বুকটা ভারি হয়ে যায়। ধোঁয়া, গ্যাস সব মিলে গরমে টিকে থাকাই মুশকিল।’

রাশিদার মতোই সুরাইয়া বেগমের (৫২) জীবনেও এক অনিবার্য, অথচ ক্লান্তিকর পরিসর রান্নাঘর। মেরুল বাড্ডার একটি বাসায় তিনি থাকেন পরিবারসহ। ঘরের এক কোণে তার রান্নাঘর, দরজার সামনে চুলা, পাশে সিঙ্ক, ওপরে ছোট একটি জানালা। জানালাটা খোলা থাকলেও বাতাস ঢোকে না, কারণ পাশের বাড়ির দেয়াল। এতটাই গা লাগোয়া যে আলো-বাতাস ঢোকার পথ নেই।

‘প্রচণ্ড গরম লাগে। জানালা বন্ধ করলেই মনে হয় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। রান্না করতে করতে মাঝেমাঝে গলা শুকিয়ে যায়, মাথা ঝিমঝিম করে, প্রচুর পানি পিপাসা লাগে। বসে কাজ করি, আবার উঠে কিছু আনতে হয়। বয়স বাড়ায় শরীর ভারী হচ্ছে, ইদানিং হাঁটুতে ব্যথা হয়। আগে এত হতো না।’

রাশিদার কণ্ঠের ক্লান্তি আর সুরাইয়ার দীর্ঘশ্বাস মিলেমিশে তৈরি হয়েছে এক অব্যক্ত বাস্তবতা। যেখানে রান্না মানে যেন নিজের শরীরের সঙ্গে প্রতিদিনের এক নীরব যুদ্ধ। এই নীরব যুদ্ধের মূল কারণ শহরের বাসাগুলোর রান্নাঘরের সীমিত জায়গা ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো। ঢাকা শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার অধিকাংশ বাসারই রান্নাঘরই ছোট। সেখানে নেই পর্যাপ্ত জানালা বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা। তার সঙ্গে যদি যোগ হয় এক্সস্ট ফ্যানের অনুপস্থিতি, তাহলে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে আরও অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে রান্নাঘরের পরিবেশ। ‘বাংলাদেশের নিম্নআয়ের বাড়িতে বায়ু চলাচল  মডেলিং’ শিরোনামের একটি গবেষণায়ও উঠে এসেছে এই বাস্তবতার প্রতিফলন।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটা উঠে এসেছে ‘বায়ওমেড সেন্ট্রাল’ এর সাম্প্রতিক গবেষণায়। সেখানে দেখা গেছে, এমন বদ্ধ রান্নাঘরের বাতাসে দূষিত বস্তুকণার (পিএম ২.৫) উপস্থিতির মাত্রা গড়ে প্রতি ঘনমিটারে ৬০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের প্রায় ২০ গুণ বেশি। এই সূক্ষ্ম ধোঁয়া ও গ্যাস শুধু অস্বস্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে নারীদের ফুসফুসে। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি সময় রান্নাঘরে কাটান। তাদের শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজের (সিওপিডি) ঝুঁকি বাড়ে বহুগুণে।

আরও পড়ুন

নারীদের এই শারীরিক প্রতিকূলতার ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক মেহেদী হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘দীর্ঘসময় ছোট, অপর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ছাড়া রান্নাঘরে কাজ করার ফলে নারীদের কোমর, হাঁটু ও ঘাড়ে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি বা ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে। একপাশে ঝুঁকে বা নিচু হয়ে কাজ করার কারণে মাংসপেশি ও জয়েন্টে দীর্ঘমেয়াদি চাপ পড়ে, যা সময়ের সঙ্গে তীব্র হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ৪৫ বছর বয়সের পর।’

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানভির ইসলামের কাছ থেকে আরও বিশদ ব্যাখ্যা মেলে এর শারীরিক প্রভাবের। তার ভাষায়, ‘এ ধরনের সঙ্কুচিত ও বদ্ধ রান্নাঘরে কাজ করা নারীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়, ফলে আগের সামান্য অস্বস্তিগুলো স্থায়ী রূপ নেয়। যারা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন পরিবেশে কাজ করেন, তাদের কোমর, হাঁটু ও মেরুদণ্ডের ব্যথা দীর্ঘ চিকিৎসার পরও পুরোপুরি সারে না।’

তানভির ইসলামের মতে, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপই এখানে সবচেয়ে জরুরি। রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। ধোঁয়া বের হওয়ার জন্য চিমনি, জানালা বা এক্সস্ট ফ্যান অপরিহার্য। পাশাপাশি কাজের ভঙ্গি ঠিক রাখা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা দরকার। তার পরামর্শ, ‘যদি সম্ভব হয়, রান্নাঘরের উচ্চতা ও কাজের জায়গা এমনভাবে সাজাতে হবে যেন বারবার নিচু হতে না হয়।’

যদিও বাস্তবতা বলে, এই সমস্যার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান চোখের সামনে নেই। জায়গার সংকট, ভাড়ার চাপ ও নির্মাণ খরচ বাঁচাতে অনেক সময় বাড়িওয়ালা বা ডেভেলপাররা ছাড় দেন রান্নাঘরের নকশায়। উপেক্ষা করেন আলো ও বাতাস চলাচলের বিষয়টি। অথচ সামান্য পরিকল্পনা বা নকশাগত পরিবর্তনেই এ ঝুঁকি কমানো সম্ভব অনেকটা।

গবেষণা বলছে, যদি রান্নাঘরে ক্রস ভেন্টিলেশন অর্থাৎ দুই দিক দিয়ে বাতাস চলাচলের পথ রাখা যায়, তাহলে ধোঁয়ার ঘনত্ব প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এছাড়া জানালা উঁচু করে দিয়ে বা ছোট চিমনি ও এক্সস্ট ফ্যান লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অথচ তা হচ্ছে কোথায়!

এজন্য নকশাগত ঘাটতিকে দায়ী করেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জে. এইচ. এম. মঞ্জুর মোর্শেদ। তার ভাষায়, ‘রান্নাঘরের জায়গা ছোট হলেও ডিজাইনে কাজের ধারা, যেমন ধোয়া-মোছা, প্রস্তুতি, গ্যাস ব্যবহার ইত্যাদির ক্রম অনেক সময় ঠিকভাবে ধরা হয় না। ফলে জায়গা ছোট হলেও সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় না। আলো-বাতাসের দিকেও মনোযোগ দেওয়া হয় না, তাতে রান্নার পরিবেশ আরও বদ্ধ হয়ে ওঠে।’

ছোট জায়গাতেও কীভাবে কার্যকর নকশা করা যায়, এমন প্রশ্নে স্থপতি মঞ্জুর বলেন, ‘জানালার অবস্থান পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা গেলে সমস্যা অনেকটাই কমানো যায়। রান্নাঘরের অন্তত এক দিক উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে ক্রস-ভেন্টিলেশন সম্ভব হয়। জানালা উঁচু স্থানে থাকলে গরম বাতাস সহজে বেরিয়ে যায়। সরু জায়গাতেও বাতাস চলাচলের জন্য ভেন্টিলেশন শ্যাফট বা লাইটওয়েল রাখা গেলে আলো ও বাতাসের কিছুটা প্রবাহ পাওয়া যায়।’

তাছাড়া রান্নাঘরের উচ্চতা ব্যবহারকারীর গড় উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এক্সস্ট ফ্যান চুলার ঠিক উপরে না বসিয়ে, বরং যেখানে ধোঁয়া জমে সেখানে বসানো উচিত, এতে এর কার্যকারিতা বাড়ে। আর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করলে ছোট জায়গাতেও তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad