‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীলতার বিস্তার শুধু কবিতা বা গানের ভুবনে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর যুগেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন গল্প, চিত্রনাট্য, অভিনয়, সংগীত পরিচালনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে। জীবদ্দশায় তিনি যেমন পর্দার মানুষ ছিলেন, মৃত্যুর পরও তেমনি তার গান, গল্প ও ভাবনা বেঁচে আছে বাংলা সিনেমা, নাটক, প্রামাণ্যচিত্র, এমনকি বলিউডের পর্দাতেও। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আলো-আঁধারির জগতে নতুনভাবে ফিরে আসছেন নজরুল—কখনো সুর হয়ে, কখনো চরিত্র হয়ে, কখনো প্রতিবাদের ভাষা হয়ে।
চলচ্চিত্রকার নজরুল
বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের একদম শুরুর দিকেই নজরুলের প্রবেশ। ১৯৩০-এর দশকে কলকাতার চিত্রজগতে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন প্রায় বিশটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে। ১৯৩৪ সালে সত্যেন্দ্রনাথ দের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেন ‘ধ্রুব’ ছবিটি। এতে তিনি নারদের চরিত্রে অভিনয়ও করেন। ছবিটির ১৮টি গানের মধ্যে ১৭টিই ছিল তার লেখা ও সুরের।
১৯৩৭ সালে ‘বিদ্যাপতি’ সিনেমার গল্প ও চিত্রনাট্য লেখেন নজরুল ও দেবকী বসু। ছবিটি লাহোর, মুম্বাই, কলকাতা থেকে শুরু করে সিলেট, ঢাকা, বরিশাল ও রেঙ্গুন পর্যন্ত প্রদর্শিত হয়েছিল। একই বছর ‘গ্রহের ফের’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেন তিনি। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘গোরা’ ছবির সংগীত পরিচালকও ছিলেন নজরুল। রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি সেই ছবিতে তিনি নিজের একটি গান এবং ‘বন্দে মাতরম’ ব্যবহার করেন।
১৯৩৯ সালে মুক্তি পায় ‘সাপুড়ে’। বেদে সম্প্রদায়ের জীবন নিয়ে নির্মিত এই ছবির কাহিনিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। ছবিটি ব্যবসাসফল হয়েছিল। এর হিন্দি রিমেকও তৈরি হয়, নাম ‘সাপেরা’। পরে ১৯৪২ সালে ‘চৌরঙ্গী’ ছবিতে তিনি গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ছবিটির হিন্দি সংস্করণের জন্য সাতটি হিন্দি গানও লেখেন তিনি। হাস্যরসাত্মক ছবি ‘হাল বাংলা’তেও ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নজরুল।
দেশীয় চলচ্চিত্রে নজরুলের গল্প ও গান
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নজরুলের সৃষ্টি বারবার ফিরে এসেছে। ১৯৭১ সালে খান আতাউর রহমান পরিচালনা করেন ‘সুখ-দুঃখ’, যা নজরুলের গল্প ‘পদ্মাগোখরা’ অবলম্বনে নির্মিত। ১৯৭৬ সালে মোস্তাফিজ পরিচালনা করেন ‘মায়ার বাঁধন’, সেটিও একই গল্পের আরেক রূপ। নজরুলের ‘জিনের বাদশাহ’ গল্প থেকে নির্মিত হয় একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যেখানে অভিনয় করেন বাপ্পারাজ।
ইমপ্রেস টেলিফিল্মের উদ্যোগে ২০০৫ সালে মুক্তি পায় ‘মেহের নেগার’। ছবিটি পরিচালনা করেন মুশফিকুর রহমান গুলজার ও মৌসুমী; অভিনয়ে ছিলেন ফেরদৌস ও মৌসুমী। ২০০৬ সালে মতিন রহমান পরিচালিত ‘রাক্ষসী’তে অভিনয় করেন রোজিনা, ফেরদৌস ও পূর্ণিমা। ২০১৪ সালে গীতালী হাসান পরিচালনা করেন ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, এটিও ছিল নজরুলের রচনা অবলম্বনে নির্মিত। এ ছাড়া বাংলাদেশের অসংখ্য চলচ্চিত্রে নজরুলের গান ব্যবহৃত হয়েছে পটভূমির সংগীত হিসেবে।
বলিউডে ‘পিপ্পা’ বিতর্ক
২০২৩ সালে বলিউডে মুক্তি পায় ১৯৭১ সালের যুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘পিপ্পা’। ছবিটিতে ব্যবহার করা হয় নজরুলের বিখ্যাত গান ‘কারার ওই লৌহকপাট’। এতে নতুন সুরায়োজন করেন এ আর রহমান। তবে সুরে পরিবর্তন আনায় তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। প্রতিক্রিয়ায় নজরুলের নাতি কাজী অনির্বাণ বলেন, গানটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও সুর পরিবর্তনের অনুমতি ছিল না। নাতনি অনিন্দিতা কাজীও জানান, এই বিকৃতি তারা মেনে নিতে পারছেন না। সংগীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা একে ‘পবিত্র কিছুর অমর্যাদা’ বলে আখ্যা দেন। বিতর্কটি ভিন্নভাবে হলেও বলিউডে নজরুলের গানের প্রভাবকেই সামনে নিয়ে আসে।
প্রামাণ্যচিত্র ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
নজরুলকে নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে একাধিক প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশে মুক্তি পায় ‘বায়োগ্রাফি অব নজরুল’। ফেরদৌস খান পরিচালিত এই ৯৪ মিনিটের তথ্যচিত্রে আসাদুজ্জামান নূরের কণ্ঠে তুলে ধরা হয় নজরুলের জীবনকথা। ছবিটি ঢাকার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় এবং ২০২০ সালের সিনেমেকিং ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা ফিচার ফিল্মের পুরস্কার অর্জন করে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৯৮২ সালে নির্মিত ‘নজরুল’ ছবিটি তার জীবন ও সংগীতকে পর্দায় তুলে ধরে। এ ছাড়া তার জীবন নিয়ে আরও কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে।
নাটক ও মঞ্চে নজরুল
টেলিভিশন নাটকে নজরুলের উপস্থিতি আরও ব্যাপক। বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে শুরু করে বেসরকারি চ্যানেলগুলো তার জন্মবার্ষিকীতে বিশেষ নাটক প্রচার করে আসছে। নজরুলের গান এসব নাটকে শুধু পটভূমির সুর নয়, কখনো তা চরিত্রের ভাষা হয়ে ওঠে, কখনো দৃশ্যের আবেগ বহন করে।
ঢাকার মঞ্চনাটকে নজরুলের রচনা নিয়ে পরিবেশনা হয়েছে একাধিকবার। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছে ভিন্ন ভিন্নভাবে—কোথাও একক আবৃত্তিনাট্য, কোথাও পূর্ণাঙ্গ মঞ্চনাটক হিসেবে। নজরুলের লেখা নাটক ‘আলেয়া’, ‘মধুমালা’ ও ‘ঝিলিমিলি’ও মঞ্চে এসেছে বহুবার।
গান যখন সীমানা পেরোয়
নজরুলের গান এখন শুধু বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। ত্রিপুরা, আসাম ও ঝাড়খণ্ডেও নজরুলগীতির চর্চা রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তার গান বিদেশের মাটিতে বাংলার স্মৃতি বহন করে। ভারতে তার গান ওড়িয়া ভাষায় অনুবাদ করেও অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়েছে।
নজরুলের মোট গানের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। ইসলামি গান, শ্যামাসংগীত, গজল, রাগপ্রধান গান, দেশাত্মবোধক গান—বৈচিত্র্যময় এই সংগীতভান্ডার চলচ্চিত্রের নির্মাতাদের হাতে বারবার নতুন প্রাণ পেয়েছে। বিভিন্ন মেজাজের দৃশ্যে তার গান তৈরি করেছে আলাদা আবহ।
নজরুল মারা গেছেন ১৯৭৬ সালে। কিন্তু পর্দায় তিনি থেমে যাননি। কখনো চরিত্র হয়ে, কখনো গান হয়ে, কখনো বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে তিনি বারবার ফিরে আসেন। এটাই তার অমরত্ব। কবি শুধু বইয়ের পাতায় বেঁচে থাকেন না; বেঁচে থাকেন তখনই, যখন তার গান আলো-আঁধারির পর্দায় ভেসে ওঠে, আর মানুষ নীরবে শুনতে থাকে।


