ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোকে কেন্দ্র করে শনিবার রাতে উত্তেজনা, ধস্তাধস্তি ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনাস্থলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বিকালে চানখারপুল মোড় থেকে এক সাবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে আটক করার পর।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সাউন্ড বক্সে ৭ মার্চের ভাষণ বাজাচ্ছিলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা জোনের ডিসি মাসুদ আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের যেহেতু পদধারী নেতা এবং ছাত্রলীগ যেহেতু নিষিদ্ধ আর জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকার কথা আমরা শুনছি এবং কিছু লিঙ্ক পেয়েছি, এগুলা দেখে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’
এই আটক ঘটনার প্রতিবাদে এবং আটক শিক্ষার্থীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী শনিবার রাত ৯টা ৩৫ মিনিটের দিকে শাহবাগ থানার সামনে ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতে শুরু করেন। তারা একটি রিকশায় মাইক সংযুক্ত করে ভাষণটি প্রচার শুরু করেন।
মাইকে ভাষণ প্রচারের সময় প্রথমে সেখানে কয়েকজন ব্যক্তি এসে ভাষণ বন্ধ করার কথা বললে তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘সাধারণ জনগণ’ পরিচয়ে একদল লোক শাহবাগ থানার সামনের দিক থেকে এসে ভাষণ বাজারে বাধা দেয়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে রিকশায় রাখা মাইক ভাঙচুর করা হয় এবং মাইকের ব্যাটারি নিয়ে হামলাকারীরা শাহবাগ থানার ভেতরে চলে যান। এ সময় শাহবাগ থানার ভেতরে অবস্থানরত কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, যে গ্রুপটি হামলা চালায় তাদের শাহবাগ থানার সামনে থেকে আসতে দেখা যায় এবং পরে তাদের থানার ভেতরে প্রবেশ করতেও দেখা যায়।
ঘটনার পর আয়োজক শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি বলেন, ‘বিনা উসকানিতে অসম যে হামলাটি করা হলো এটি তো অত্যন্ত ধিক্কারজনক এবং তাদের যে ইনসিকিউরিটি তা প্রমাণ করে যে আমরা ইতিহাসের সঠিক দিকে আছি।’
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে জামায়াত বাদে কারো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চুলকানি নাই, ছাত্রদল হোক ছাত্রলীগ হোক প্রত্যেকটা সংগঠনে এরা ঢুকে বসে আছে। শুধুমাত্র এই রাজাকারের বাচ্চারা বাদে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সেসব নিয়ে কোনো বিরোধীতা নাই।’
এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ বলেও মন্তব্য করা হয়।
এ বিষয়ে ডিসি মাসুদ আলম বলেন, ‘তারাবীর নামাজের সময় এখানে মাইক নিয়ে এসে মাইক বাজানো এটা তো সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক। এটা তো মব তৈরি করার চেষ্টা করা।’
পরবর্তীতে জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরাও সেখানে উপস্থিত হয়ে ভাষণ বাজানোর বিরুদ্ধে স্লোগান ও বক্তব্য দেন। এ সময় জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাবি কমিটির আহবায়ক তাহমিদ আল মুদাসসির চৌধুরী বলেন, ‘আজ বিকালে যাকে আটক করা হয়েছে তাকে ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোর জন্য আটক করা হয়নি বরং সে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাথে জড়িত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে যারা তাকে মুক্তিযুদ্ধের আড়ালে, ৭ মার্চের আড়ালে এই ছাত্রলীগারকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
পরে সেখানে ডাকসুর কয়েকজন নেতা উপস্থিত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের। তারাও ভাষণ বাজানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
রাত প্রায় ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে আরও উত্তেজনা তৈরি হয়।
এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযোগ তুলে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মী ও উপস্থিত কিছু বিক্ষোভকারী মারধর করেন। মারধরের শিকার ওই শিক্ষার্থীর নাম আল মামুন, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
প্রাথমিক ধস্তাধস্তির পর জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দেকের নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে অবস্থান নেন। পরে তারা রিকশায় বসে থাকা আয়োজক শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে রিকশাসহ শাহবাগ থানার ভেতরে নিয়ে যান।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, মোসাদ্দেক রিকশার প্যাডেল ধরে রিকশাটি থানার ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন।
এ সময় ইমির সঙ্গে থাকা আল মামুনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে তাকে মারধর করে প্রথমে শাহবাগ থানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে আবার তাকে টেনে-হিঁচড়ে থানার ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুরো সময় ইমি আল মামুনকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। এক পর্যায়ে পিছন থেকে একজন ইমির চুল ধরে টান দেন। পরে ইমি এবং আল মামুন দুজনকেই শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়।
ঘটনার পর শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘আল মামুন এর উপর হামলা করসে জুবায়ের আর মোসাদ্দেকের নেতৃত্বে। আমার গায়েও হাত তুলেছে। যতদিন বেঁচে থাকব, দাবায়ে রাখতে পারবা না।’
বিকালে চানখারপুল মোড়ে ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের পদধারী একজনকে পুলিশ আটক করলে ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শাহবাগ থানার সামনে ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোর ঘোষণা দেন।


