ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট বা ডাকযোগে পাঠানো ভোটে বড় ধরনের আধিপত্য দেখিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। সারা দেশের ২৯৯টি পোস্টাল ব্যালট কেন্দ্রের মধ্যে এই জোটটি ২৫৫টিতেই বিজয়ী হয়েছে। বিএনপি সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হলেও পোস্টাল ব্যালটে তারা মাত্র ৪১টি কেন্দ্রে জয়ী হতে পেরেছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সিরাজগঞ্জ-৪ ও মাদারীপুর-১ আসনে সাধারণ ভোটকেন্দ্রের গণনায় এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের ফলাফল পোস্টাল ব্যালট যোগ হওয়ার পর সম্পূর্ণ উল্টে গেছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে পোস্টাল ব্যালটের এই চিত্র পাওয়া গেছে।
দশ লাখের বেশি ভোট, অর্ধেকই জামায়াতের
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এবারের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করেছিলেন প্রায় ১৫ লাখ ভোটার। এর মধ্যে প্রবাসী, নির্বাচনী কর্মকর্তা, নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং কারাবন্দীরা ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৪ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেন, যা মোট নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় ৭০ শতাংশ। তবে ব্যালট পূরণে ত্রুটি এবং দেরিতে পৌঁছানোর কারণে ৫৭ হাজারেরও বেশি ভোট বাতিল করে দেয় নির্বাচন কমিশন।
বৈধ ভোটের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক ভোটই পেয়েছে জামায়াত। দলটি এককভাবে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১১৪টি ভোট পেয়েছে, যেখানে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বিএনপি পেয়েছে ৩ লাখ ২২ হাজার ১৪৪ ভোট। এ ছাড়া এনসিপি ৫২ হাজার ৮৪০ ভোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩৩ হাজার ১৫০ ভোট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৩ হাজার ২০৫ ভোট এবং জাতীয় পার্টি ৮ হাজার ৩৭৯ ভোট পেয়েছে।
কোন দলের কত জয়
ইসির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াত সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা ২৯৯টি পোস্টাল ব্যালট কেন্দ্রের মধ্যে ২৫৫টিতে জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে জামায়াত এককভাবে ২১০টি, এনসিপি ১৭টি, খেলাফত মজলিস ১৬টি, এলডিপি ৩টি, খেলাফত মজলিসের অন্য অংশ ৫টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২টি এবং এবি পার্টি ২টি কেন্দ্রে জয়লাভ করেছে।
বিএনপির জয় ৪১ কেন্দ্রে
বগুড়ার আসনগুলোতে বিএনপি পোস্টাল ব্যালটে তুলনামূলক ভালো ফলাফল করলেও অন্যান্য এলাকায় ভালো করতে পারেনি। তাদের জোটের অন্য দলগুলো কোনো কেন্দ্রেই জয়ী হতে পারেনি। তবে তিনটি কেন্দ্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছেন। পটুয়াখালী-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন ৭৮৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে বিএনপি সমর্থিত নুরুল হক নূর ৫৫৭ এবং জামায়াত প্রার্থী মুহাম্মদ শাহ আলম ৪৮২ ভোট পান। ময়মনসিংহ-১ আসনে ঘোড়া প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ১ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন। এ ছাড়া ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম যারা ১ হাজার ১৬৫ ভোট পেয়ে শীর্ষস্থান দখল করেন, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হাবিবুর রশিদ পান ১ হাজার ১০১ ভোট।
দুই আসনে ফলাফল উল্টে দিল পোস্টাল ব্যালট
সিরাজগঞ্জ-৪ ও মাদারীপুর-১ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে পোস্টাল ব্যালট সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে সাধারণ ভোটকেন্দ্রে বিএনপির এম আকবর আলী এক লাখ ৬০ হাজার ৪৫৮ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। জামায়াতের রফিকুল ইসলাম খান পেয়েছিলেন এক লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৩ ভোট। কিন্তু রফিকুল ইসলাম খান ২ হাজার ১৭৯টি পোস্টাল ভোট পাওয়ায় এবং আকবর আলী মাত্র ৮২০ ভোট পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে জামায়াত প্রার্থী বিজয়ী হন।
একইভাবে মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির নাদিরা আক্তার সাধারণ ভোটেকেন্দ্রে ৭৮৬ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। তবে পোস্টাল ব্যালটের গণনায় ১১ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাঈদ উদ্দিন আহমদ হানজালা জয়ী হন। হানজালা এক হাজার ৩৯৮টি পোস্টাল ভোট পান, যেখানে নাদিরা আক্তার পান মাত্র ২৩৩ ভোট। ফলে চূড়ান্ত ফলাফলে হানজালা ৩৮৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী ঘোষিত হন।
এক আসনে হেরেছেন তারেক রহমান
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুটি আসনে জয়ী হলেও ঢাকা-১৭ আসনের পোস্টাল ব্যালট কেন্দ্রে হেরে গেছেন। সেখানে তিনি পান এক হাজার ২৫৬ ভোট, বিপরীতে জামায়াত প্রার্থী খালিদুজ্জামান পেয়েছেন দুই হাজার ৩২৮ ভোট।
অন্যদিকে, ঢাকা-১৫ আসনে ২ হাজার ৭৯০ ভোট পেয়ে পোস্টাল ব্যালটে জয়ী হয়েছেন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। এ ছাড়া এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম নিজ নিজ আসনে পোস্টাল ব্যালটে জয়ী হয়েছেন। তবে পোস্টাল ব্যালটে পরাজয় বরণ করেছেন জাতীয় পার্টির জিএম কাদের, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, এনডিএম-এর ববি হাজ্জাজ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি এবং নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না।
পোস্টাল ভোট বাড়ানোর পরিকল্পনা ইসির
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, আগামী নির্বাচনে পোস্টাল ভোটের পরিধি আরও ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে ইসি। তিনি বলেন, সীমিত সময়ের মধ্যে এই ব্যবস্থা চালু করা হলেও এটি অত্যন্ত সফল হয়েছে এবং বিশ্বের অন্য কোনো দেশে পোস্টাল ভোটে এত সাড়া পাওয়া যায় না।
তিনি আরও জানান, ১২৩টি দেশ থেকে ৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছিলেন। সৌদি আরবসহ ২০টি দেশের ৯৬ শতাংশ প্রবাসী ভোট দিয়েছেন।
ভবিষ্যতে সাংবাদিক, প্রবীণ নাগরিক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও এই প্রক্রিয়ায় সহজভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ।
এদিকে, ওসিভিআই-এসডিআই প্রজেক্টের টিম লিডার সেলিম আহমেদ খান বলেন, পোস্টাল ভোট সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। বিশেষ করে যারা যাতায়াত খরচের অভাবে গ্রামে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না, তাদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হতে পারে।


