ফিলিস্তিনকে ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে মতবিরোধে জড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার। আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন স্টার্মার। তবে এর তীব্র বিরোধিতা করে গাজাকে সশস্ত্র সংগঠন হামাস ‘ফাঁদ’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প।
বিবিসি’র খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টার্মারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই নেতার মধ্যে এ মতবিরোধ হয়।
বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪৭টি দেশই ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। যুক্তরাজ্য এ তালিকায় যোগ দিলে, প্রতীকী হলেও তা শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দেবে।
বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গেও কথা বলেন দুই নেতা। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি হতাশা জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘শান্তি আলোচনায় অংশ না নিয়ে পুতিন আমাকে “হতাশ” করেছেন।’ এসময় পশ্চিমা মিত্রদের রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধেরও আহ্বান জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে একই অবস্থান নেন ট্রাম্প ও স্টার্মার। যুক্তরাজ্যে অবৈধ অভিবাসী প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরামর্শ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, চেকার্সে (প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) বৈঠকের সময় তিনি স্টার্মারের সঙ্গে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে আমি সীমান্ত সুরক্ষায় যে পদক্ষেপ নিয়েছি, যুক্তরাজ্যও ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়া অভিবাসীদের কারণে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি।’
‘আপনাদের দেশে মানুষ ঢুকছে, আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি- আমি হলে এটা থামাতাম। সেনাবাহিনী ডাকতে হলেও ডাকবেন, যেকোনো উপায়ে থামাতে হবে’, যোগ করেন তিনি।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘অবৈধ অভিবাসন “দেশকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়” এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন অবৈধভাবে প্রবেশ করা বহু মানুষকে দেশ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।’ ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে স্টার্মার বলেন, তার সরকার এ সমস্যাকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে’ দেখছে।
ব্রিটিশ ও মার্কিন সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বেও দুই নেতা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি, বাকস্বাধীনতা, ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক ‘বিশেষ সম্পর্ক’ আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা জানিয়ে নতুন প্রযুক্তি চুক্তি ঘোষণা করেন। ট্রাম্প জানান, দুই দেশেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ‘আধিপত্য বিস্তারে’ যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করবে।
এ চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোম্পানিগুলো যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ করবে এবং এআই, কোয়ান্টাম ও অন্যান্য প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়াবে।

অবশ্য হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়েলস জানান, এই সফর ব্রিটেনের বাণিজ্য বা পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো বাড়তি প্রভাব ফেলবে না। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক বলেন, ‘যদি ব্রিটেন বিদেশি বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করতো, তাহলে এআই বিনিয়োগ চুক্তিটি দশ গুণ বড় হতে পারত।’
সংবাদ সম্মেলনে বেশ কিছু বিষয় এড়িয়ে যান ট্রাম্প ও স্টার্মার। বিশেষ করে, লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে অপসারণ প্রশ্নে কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি ট্রাম্প কিংবা স্টার্মার। এমনকি যুক্তরাজ্যে বাক স্বাধীনতা ‘হুমকির মুখে’ পড়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগের বিষয়েও অবস্থান স্পষ্ট করেননি দুই নেতা।
এর আগে রাষ্ট্রীয় সফরের প্রথম দিনে উইন্ডসর ক্যাসেলে জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজের মাধ্যমে ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়াকে স্বাগত জানান ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যরা। এ সময় রাজা তৃতীয় চার্লস ও যুবরাজ প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করে এমন ঘনিষ্ঠ বিষয়ে আলোচনা করেন ট্রাম্প।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী স্টার্মারের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা শেষে ট্রাম্প দম্পতি স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাজ্য ত্যাগ করেন।


