ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির পথে বিশ্ব: দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের নতুন অধ্যায়

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির পথে বিশ্ব: দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের নতুন অধ্যায়
গাজার ক্ষুধার্ত শিশুরা। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

দীর্ঘসময় ধরে চলা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত সমাধানে দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানের পথে হাঁটছে অনেক দেশ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলে স্মরণকালের ভয়াবহ হামলা চালালে গাজাবাসীর ওপর নির্মম হামলা শুরু করে তেল আবিব। এতে এ পর্যন্ত ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন প্রায় দেড় লাখ।

অবরুদ্ধ গাজায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে। দীর্ঘসময় ধরে চলা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত সমাধানে দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানের পথে হাঁটছে অনেক দেশ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি ও বিবিসির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স। একই পথে হাঁটছে আরও দেশ। সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টাসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র।

তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগেই বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত ‘হামাসের সন্ত্রাসবাদ’কে পুরস্কৃত করার শামিল। যুক্তরাষ্ট্রও শক্তভাবে এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির অর্থ কী?

কাগজে-কলমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নেই। তবে বহু দেশ ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কূটনৈতিক মিশন রয়েছে। অলিম্পিকসহ আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায়ও অংশ নেয় তারা।

কিন্তু ফিলিস্তিনের কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা, রাজধানী বা সেনাবাহিনী নেই। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব এবং গাজায় সামরিক আগ্রাসন তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই স্বীকৃতি অনেকটাই প্রতীকী। নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এটি শক্ত পদক্ষেপ হলেও বাস্তবে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি তেমন বদলাবে না। তবে প্রতীকী এই পদক্ষেপও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

ইতিহাসে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান

১৯৯০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।

যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি জুলাইয়ে জাতিসংঘে এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থনে ব্রিটেন একটি বিশেষ দায়বদ্ধতা অনুভব করে।’

সে সময় তিনি ১৯১৭ সালের ব্যালফোর সনদের উল্লেখ করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার ব্যালফোরের তত্বাবধানে ওই সনদ স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় ‘ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য জাতীয় আবাস প্রতিষ্ঠার’ বিষয়টি সমর্থন করেছিল যুক্তরাজ্য।

আরও পড়ুন

সনদে উল্লেখ ছিল, ‘ফিলিস্তিনে থাকা ইহুদি নয় এমন মানুষের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুন্ন করে’ এমন কোনো কার্যক্রম সেখানে পরিচালনা করা যাবে না। একসময় ফিলিস্তিন হিসেবে পরিচিত ওই ভূখণ্ড ১৯২২ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত লিগ অব নেশনসের এক ম্যান্ডেটের আওতায় বৃটিশরা শাসন করে। এরপর ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র তৈরি হয়। ইসরায়েলের পাশাপাশি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রয়াসও চলতে থাকে।

১৯৬৭ সালের ইসরায়েল-আরব যুদ্ধের আগে ওই অঞ্চল যেভাবে বিভক্ত ছিল, সেই বিভক্তির ভিত্তিতেই দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে বলে বলা হয়ে আসছিল। ১৯৬৭ সালে যুদ্ধের পর ইসরায়েলের দখলে চলে যাওয়া পূর্ব জেরুজালেমের হওয়ার কথা ছিল ফিলিস্তিনের রাজধানী।

তবে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক প্রয়াস চলমান থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান আসেনি। আর এর মধ্যে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখল যত বেড়েছে, দ্বিরাষ্ট্র সমাধান ততটাই দূরবর্তী হয়েছে।

কোন কোন দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে?

জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪৫টি দেশ ইতোমধ্যেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এতে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগালও যুক্ত হয়েছে।

ফিলিস্তিন জাতিসংঘে স্থায়ী পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে রয়েছে। অর্থাৎ তারা আলোচনায় অংশ নিতে পারে, কিন্তু ভোট দিতে পারে না।

চীন ও রাশিয়া ১৯৮৮ সালেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ক্রমেই একঘরে হতে হচ্ছে।

কারা এখনো স্বীকৃতি দেয়নি?

ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্রসহ অন্তত ৪৫টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি। এশিয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর; আফ্রিকায় ক্যামেরুন; লাতিন আমেরিকায় পানামা এবং ওশেনিয়ার অধিকাংশ দেশও তালিকায় নেই।

ইউরোপে বিভাজন সবচেয়ে বেশি। ২০১৪ সালে সুইডেন প্রথম পশ্চিম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। ২০২৪ সালে নরওয়ে, স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়া তাদের অনুসরণ করে। তবে জার্মানি ও ইতালি স্বীকৃতি দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের কড়াকড়ি অবস্থান

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রকাশ্যেই ইসরায়েলপন্থী ছিল। বর্তমান প্রশাসনও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে হামাস “শক্তি সঞ্চয় করবে” এবং ইসরায়েলকে প্ররোচিত করবে পশ্চিম তীর আলাদা করে দিতে।’

তবুও গাজায় দুর্ভিক্ষ, ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন ও বৈশ্বিক ক্ষোভের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও স্বীকৃতির ঢেউ থামানো যাচ্ছে না।

কূটনৈতিক ও আইনি জটিলতা

ফ্রান্সের অ্যাইক্স-মার্সেইল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোমাঁ লে বোফে বলেন, ‘ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম জটিল প্রশ্ন। স্বীকৃতি দেওয়া মানেই নতুন রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে নয়, আবার স্বীকৃতি না দেওয়াও কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকার নয়।’

আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডসের মতে, প্রতীকী এই স্বীকৃতিই পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। একবার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিলে আন্তর্জাতিক আইনে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad