চলতি বিশ্বকাপে মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি মাঠের বাইরের এক ভিন্ন ‘ম্যারাথন’ নিয়ে চরম তোপের মুখে পড়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। যত বেশি সম্ভব ম্যাচে গ্যালারিতে উপস্থিত থাকার তার এই অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা ক্রীড়াপ্রেমীদের আনন্দ দিলেও তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে পরিবেশবাদীদের মনে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তার এই চরম উদাসীনতা এখন বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মেক্সিকো সিটি থেকে শুরু করে গুয়াদালাহারা, লস অ্যাঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিসকো, ভ্যাঙ্কুভার, সিয়াটল কিংবা হিউস্টন—ইতালি-সুইস বংশোদ্ভূত এই ফুটবল প্রধান গত সাত দিনে ১০টি ম্যাচে হাজির হতে ডজনখানেক বার নিজের প্রাইভেট জেটটি ব্যবহার করেছেন।
কাতার এয়ারওয়েজের দেওয়া এই বিলাসবহুল প্রাইভেট জেটের প্রতি ইনফান্তিনোর এই অতি-মোহ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘জসিমার’ ফাঁস করেছিল যে, পূর্ববর্তী তিন বছরে ইনফান্তিনো এই বিমানে প্রায় ৬ লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো জুড়ে ৪৮টি দলের বিশাল বিশ্বকাপ হওয়ায় ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে একলাফে ১০৪টিতে ঠেকেছে। আর এটিই ফিফা প্রধানের এই বিমান ভ্রমণের নেতিবাচক প্রভাবকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা কার্বন নির্গমন মূল্যায়নে বিশেষায়িত ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিনলি’ চলতি সপ্তাহে একটি চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য দিয়েছে। তাদের মতে, এই প্রাইভেট বিমানে মাত্র এক ঘণ্টা ভ্রমণ করলে যে পরিমাণ কার্বন নির্গত হয়, তা একজন গড় মানুষের পুরো এক বছরে নির্গত কার্বনের সমান!
ইনফান্তিনো যদি শেষ ১৬ বা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিদিন দুটি করে শহরে যাতায়াত বজায় রাখেন এবং এরপর শেষ আটটি ম্যাচে উপস্থিত থাকেন, তবে গ্রিনলির অনুমান অনুযায়ী, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে শুধু তার এই বিমানের কারণে ৩০০ থেকে ৫০০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে মিশবে। যা প্রায় ৩৫ থেকে ৫৫ জন ফরাসি নাগরিকের বার্ষিক কার্বন নির্গমনের সমান।
অবশ্য ফিফা তাদের সভাপতির এই আকাশভ্রমণের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে যে, তাদের নির্বাহীরা বাণিজ্যিক নাকি ব্যক্তিগত ফ্লাইটে যাতায়াত করবেন তা নির্ধারণ করা হয় মূলত কার্যকারিতা এবং সাশ্রয়ের ওপর ভিত্তি করে, এবং সব ক্ষেত্রেই সংস্থাটি ভ্রমণের যাবতীয় খরচ বহন করে।
লজান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিদ ডেভিড গগিশভিলি এএফপিকে বলেন, ফিফা এখানে পরিবেশবান্ধবতার এক চরম বৈপরীত্য তৈরি করেছে। একটি মহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা দূরবর্তী স্টেডিয়ামগুলো পুনরায় ব্যবহারের মাধ্যমে ফিফা এমন একটি মডেল তৈরি করেছে, যা কাঠামোগতভাবেই উচ্চ-নির্গমনকারী বিমান ভ্রমণের ওপর নির্ভরশীল। নেতৃত্ব নিজেই যখন প্রাইভেট জেটে করে এক ম্যাচ থেকে অন্য ম্যাচে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তখন এটি সামগ্রিক ব্যবস্থার বড় ধরনের ত্রুটিকেই ফুটিয়ে তোলে।
গ্রিনপিস ইউএসএ’র ওশেন ক্যাম্পেইন ডিরেক্টর জন হোসেভারও ইনফান্তিনোর এভাবে এক স্টেডিয়াম থেকে অন্য স্টেডিয়ামে ছুটে চলার তীব্র সমালোচনা করে ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘উচ্চমাত্রার দূষণকারী প্রাইভেট জেটে নির্বাহীদের দৈনিক ভ্রমণ নিশ্চিতভাবেই এই বার্তা দেয় না যে ফিফা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণটি বুঝতে পেরেছে কিংবা এর সমাধানে নিজেদের দায়িত্ব স্বীকার করে।’
এই ভৌগোলিক বিস্তৃতির পুনরাবৃত্তি আগামী বছর ব্রাজিলে অনুষ্ঠেয় নারী বিশ্বকাপেও ঘটবে। ২০২৪ সালে ফিফা বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির যৌথ বিডকে বাদ দিয়ে ব্রাজিলকে বেছে নেয়, যেখানে শতভাগ ট্রেনে যাতায়াতের পরিবেশবান্ধব সুবিধা ছিল। ২০৩০ সালের পুরুষ বিশ্বকাপের শতবর্ষী আসরে এটি আরও চরম রূপ নেবে, যখন মরক্কো, পর্তুগাল এবং স্পেনের যৌথ আয়োজনের পাশাপাশি তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে দূরবর্তী দক্ষিণ আমেরিকায়।
বিশ্বকাপে প্রাইভেট জেটের ব্যবহার কেবল ফিফা নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ব্রিটিশ জার্নাল ‘নেচার’ উল্লেখ করেছে, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ১ হাজার ৮৪৬টি প্রাইভেট জেটের সমাগম ঘটেছিল–যা সুপার বোল, কান চলচ্চিত্র উৎসব এবং দাভোসের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি।
মার্কিন শিক্ষাবিদ টিম ওয়াল্টার্স গত বছর ‘প্লে দ্য গেম’ নামক এক আলোচনায় স্পষ্ট করে বলেছিলেন, একটি বিশ্বকাপের সঙ্গে জড়িত সমস্ত কার্বন নির্গমনই আসলে জীবনধারণের জন্য নয়, বরং বিলাসিতার অংশ; কারণ এই টুর্নামেন্ট আয়োজন না করলেও চলত। এই প্রেক্ষাপটে, বিশ্বমঞ্চে অতি-ধনীদের এমন বিলাসী কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে অশোভন এবং চরম হতাশাজনক।


