নব্বইয়ের দশকে ঢাকার ধানমন্ডির একটি সাধারণ সরকারি কলোনিতে আমার বেড়ে ওঠা। যেখানে সন্ধ্যা হলেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়া ছিল রীতিমতো নিয়ম। আমি আর আমার বোনেরা অধীর হয়ে সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতাম। কারণ বিদ্যুৎ গেলেই, সাবেক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাবা অন্ধকারে বসে একাত্তরের গল্প শোনাতেন–যে গল্পগুলো নিছক বীরত্বগাথা নয়, বরং কখনও কখনও যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতার নির্জন স্বীকারোক্তি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার মুখোমুখি প্রতিরোধ- এইসবের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি হতে থাকে আমার। একজন ফটোসাংবাদিক হিসেবে আন্দোলন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঘটনাগুলোকে ধারণ করাই হয়ে ওঠে আমার পেশা, আর তাতে আমি খুঁজে পাই একধরনের ছন্দ। কিন্তু জুলাইয়ের বিদ্রোহ শুরু থেকেই ছিল ভিন্ন।
১৮ জুলাইয়ের এক উষ্ণ বিকেলে বাড্ডার একটি সরু গলিতে অবস্থান করছিলাম। তখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী একটি দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দ্বিধান্বিত প্রতিবেশীদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল, ‘আমাদের সঙ্গে যোগ দাও এবং মুক্ত করো। না হলে ঘরে বসে ৭০ টাকা কেজিতে আলু কিনো!’
শব্দগুলো যেন সোজা গিয়ে আঘাত করল হৃদয়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যে রিকশাওয়ালা, দোকানদার, শিশু কোলে মায়েরা- সবাই রাস্তায় নেমে এলো। ঘটনাস্থলে থাকা স্বল্প সংখ্যক পুলিশ সদস্য তখন কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের দিকে পিছু হটতে শুরু করে। ছাত্রদের আন্দোলন দ্রুত জনতার বিদ্রোহে রূপ নেয়।
পরবর্তী দিনগুলোতে রাস্তায় পড়ে থাকা নিথর দেহ, অ্যাম্বুলেন্স, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে এক মায়ের আহাজারি- সবকিছুই আমি লেন্সবন্দী করেছি।
সেই সময় আমি ভাবছিলাম, তাহরির স্কয়ারের বিপ্লব কীভাবে আমার মিশরীয় বন্ধু, ফটোসাংবাদিক আমর আল-ফিকির জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। তখন সেই অভিজ্ঞতাকে হঠাৎই নিজের খুব কাছের বলে মনে হচ্ছিল– একটা ভয়াবহ সত্য।
৪ আগস্টের বিকেলে ঢাকার কিছু অংশ গাজা বা ফলুজাহর মতো হয়ে ওঠে– শুধু সহিংসতায় নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।
বিকেল ৫টায় আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সমর্থকেরা শিকারির মতো বিক্ষোভকারীদের দিকে গুলি ছুড়ছিল। তাদের পেছনে ছিল দাঙ্গা পুলিশের নিরাপত্তা। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল টিয়ার গ্যাস, কালো ধোঁয়া ও আতঙ্কে।
ঠিক তখন সহকর্মী ফটোগ্রাফার মাহমুদ জামান অভির ফোন এলো। তিনি বললেন, ‘ঢাকা মেডিকেলে এসো, এখনই।’

অ্যাসাইনমেন্টের মাঝপথে ক্যামেরা নামানো আমার অভ্যাস নয়। কিন্তু সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আমি থমকে গেলাম। রক্তে ভেজা স্ট্রেচারগুলো করিডোরে আটকে ছিল। স্বেচ্ছাসেবকেরা স্যালাইনের জন্য চিৎকার করছিল। কিশোররা আহত অবস্থায় মাটিতে পড়ে ছিল, তারা অপরিচিতদের হাত আঁকড়ে ধরেছিল চুপচাপ। মনে হচ্ছিল আমি যেন আল-শিফা হাসপাতালে, গাজায় চলে এসেছি।
সাহায্য করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাকে তাড়া করছিল- হয়তো কারও ক্ষত চেপে ধরা, কিংবা সময়টাকে কয়েক মিনিট পেছনে টেনে নেওয়ার বাসনা। কিন্তু আমি জানতাম কাউকে বাঁচাতে পারব না। তবে আমি পারি সেসব মুহূর্ত ধারণ করতে– কারণ অন্যরা যখন পারে না, আমরা সাংবাদিকরাই তখন সাক্ষ্য হয়ে থাকি। সেই মুহূর্তগুলো হৃদয় ভেঙে দিলেও আমাদের দায়িত্ব সেখানেই।
সেই রাতে সহকর্মীদের সঙ্গে ফোনালাপে একটা স্পষ্ট উপলব্ধি তৈরি হয়– এটা আর কেবল রাজনৈতিক সংকট নয়, গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে দেশ। হয় শেখ হাসিনা পরদিন সকালে পালাবেন, না হয় রাস্তায় রক্তপাত চলতেই থাকবে।
সকালে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙল। দ্রুত ভেস্ট পরে বেরিয়ে পড়লাম বাড্ডার দিকে, যেখানে মনে হচ্ছিল বিদ্রোহের শেষ অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
সেখানে গিয়ে দেখি, সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা মাইক দিয়ে বলছেন, ‘আমরা গুলি করতে চাই না।’
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই সব শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট– সবকিছু ফিরে আসে। বিক্ষোভকারীরা আবার সংগঠিত হয়, লড়াই চলে বিকেল পর্যন্ত।
হঠাৎ খবর আসে– শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন। সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আমি আর অভি একে অপরের দিকে তাকালাম। অভি ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আর কোনো তরুণের নিথর দেহ নয়।’
সে মুহূর্তে স্বস্তি এলেও তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। আমরা বুঝে গিয়েছিলাম– এটা কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের শুরু।

এরপর যা শুরু হল, তা শান্তি নয়, বরং এক শূন্যতা। বিজয় মিছিলে গুলিবর্ষণ চলাকালে বাড্ডায় সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশ গুলি চালায়। তিনজন প্রাণ হারান। তাদের মধ্যে একজনের মৃতদেহ মিছিলকারীরা সেনাবাহিনীর জিপের ওপর তুলে দেয়।
‘আমরা ন্যায়বিচার চাই!’- গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিল সবাই।
এক বছর কেটে গেছে। আমি আজও সংঘাতের ছবি তুলছি। রাবার বুলেট ও স্প্লিন্টারের আঘাতে পায়ের ক্ষত এখনো জ্বালা দেয়। তবে যেসব ক্ষত দেখা যায় না, সেটা হলো হৃদয়ে থাকা ক্ষত। ১ হাজার ৪০০ প্রাণের ভার বয়ে চলেছি– আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছি।


