যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোনিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কেবল প্রেম, রোমান্সনির্ভর সিনেমা ও নাটক নির্মাণ এবং সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করা হয়েছে।
রিটে অভিযোগ করা হয়েছে, এ ধরনের কনটেন্টে পরকীয়া, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ব্যভিচার ও ধর্ষণের মতো বিষয়কে স্বাভাবিক ও মহিমান্বিত করে উপস্থাপনের ফলে যুবসমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ও সামাজিক অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।
রোববার সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন। রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব, সংস্কৃতি সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিটে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও নাটক শিল্পে প্রেম এবং মাত্রাতিরিক্ত রোমান্টিক কনটেন্টের অবাধ সম্প্রচার সমাজে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মূলধারার এসব গণমাধ্যমে পরকীয়া, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ব্যভিচার ও ধর্ষণের মতো বিষয় অত্যন্ত স্বাভাবিক ও মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, এর ফলে যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। একই সঙ্গে সমাজের ঐতিহ্যবাহী নৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য তৈরি হচ্ছে বলেও রিটে দাবি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত
রিটে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস, ডেইলি সাবাহ এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনের বরাত দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করা হয়েছে, লাগামহীন রোমান্টিক ও উসকানিমূলক সিনেমা যুবসমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং নারীদের প্রতি সহিংসতা ও অপরাধ বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
রিটকারী আইনজীবী আবেদনে বলেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলেও শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা যুক্তিসসংগত বাধানিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে। তার যুক্তি, জননৈতিকতা ধ্বংসকারী এবং সামাজিক অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া কোনো কনটেন্ট অবাধে সম্প্রচারের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা প্রযোজ্য হতে পারে না। রিটে সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন সম্প্রচার আইনের উল্লেখ
রিট আবেদনে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩’-এর ৫(২) ও ৮(১) ধারার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা করা এবং এর পরিপন্থী কনটেন্টের অনুমোদন বাতিল করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিবদ্ধ দায়িত্ব।
এ ছাড়া কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬-এর ১৯ ও ২০ ধারার উল্লেখ করে রিটে বলা হয়েছে, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং যুবসমাজের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি করে, এমন সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
রিটকারীর দাবি, বিবাদীরা তাদের সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব পালনে ক্রমাগত ও ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, যা চরম প্রশাসনিক অবহেলার শামিল।
বিজ্ঞান, শিক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কনটেন্টের দাবি
রিটে শুধু প্রেমভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাণ ও সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার নির্দেশনাই চাওয়া হয়নি। যুবসমাজের সৃজনশীল মেধার বিকাশ এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করতে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ এবং সম্প্রচারে সংশ্লিষ্টদের প্রতি বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারিরও আবেদন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে গত ২৭ আগস্ট সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নোটিশ পাওয়ার পরও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এই অবস্থায় জনস্বার্থ ও জাতীয় সংস্কৃতি রক্ষার লক্ষ্যে হাইকোর্টে জনস্বার্থমূলক রিট পিটিশনটি করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


